ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে নানা বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শ্রমিকরাও রয়েছেন। তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত দাবি করে জানানো হয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা অনেক।
এইচআরএএনএ বা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য উৎস না হলেও এটি স্পষ্ট যে, ইরানের অভ্যন্তরে বিক্ষোভের একটি নতুন ও শক্তিশালী পর্যায় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিবিসি পার্সিয়ান-এর ভূমিকা এখানে লক্ষণীয়। মনে হচ্ছে তারা ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই বিক্ষোভের মাত্রাকে অতিরঞ্জিত করার মিশনে নেমেছে। তারা পরিকল্পিতভাবে ইরানি জনগোষ্ঠীর সেই বিশাল অংশকে উপেক্ষা করছে যারা সরকারের নীতির সঙ্গে একমত না হলেও ইসরায়েল বা তার পুতুল রেজা পাহলভীর ইশারায় চলতে চায় না। এটি ইসরায়েলের স্বার্থে ব্রিটিশ 'সফট পাওয়ার' ব্যবহারের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চলমান বিক্ষোভের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনেছেন: একদিকে আছে সেই সব মানুষ যাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৈধ অর্থনৈতিক ক্ষোভ রয়েছে, আর অন্যদিকে আছে তারা যারা এই আন্দোলনকে পুঁজি করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করার মতো অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চায়। আর এটাই হলো মূলত ইসরায়েলি প্রকল্প।
এই বিক্ষোভের মূলে রয়েছে ইরানের কয়েক দশকের গভীর অর্থনৈতিক সংকট। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে: ১. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অদক্ষতা। ২. যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
একইসঙ্গে, বর্তমান এ সংকটটি অনেকটা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা একটি পরিকল্পিত বিভ্রান্তিও বটে। গাজায় চলমান গণহত্যা থেকে বিশ্বের নজর সরাতে তারা লেবানন, সিরিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে টার্গেট করছে।
ইসরায়েল এখন ইরানের দিকে নজর দিচ্ছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, ফিলিস্তিনে তাদের চালানো হত্যাযজ্ঞ এবং পশ্চিম তীরের দখলদারিত্ব থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরিয়ে নেয়া। তেল আবিব মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে যত বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে, বিশ্ব তত দ্রুত গাজার কথা ভুলে যাবে। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল চায় ইরানকে ছোট ছোট জাতিগত রাষ্ট্রে বিভক্ত করতে, যেমনটা তারা লেবানন বা সিরিয়ার ক্ষেত্রে চেয়েছিল।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুশ্চিন্তা আসলে একটি অজুহাত মাত্র। ওবামা প্রশাসনের আমলে একটি পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, যা ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে তাদের লবি (যেমন আইপ্যাক) ক্রমাগত বাধা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা নেয়ার পর সেই চুক্তি বাতিল করে দেন। মূলত ইরানের শাসকগোষ্ঠী এবং সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলতেই এই নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২২ সালের 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের মতো বর্তমান বিক্ষোভগুলো ততটা স্বতঃস্ফূর্ত বা অর্গানিক নয়। বর্তমান বিক্ষোভগুলো অত্যন্ত সহিংস এবং এতে নারীদের নেতৃত্ব নেই বললেই চলে। অভিযোগ ওঠেছে যে, বর্তমান বিক্ষোভগুলোয় মোসাদ এজেন্টদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যারা উত্তেজনা ছড়ানোর জন্য মসজিদে অগ্নিসংযোগের মতো কাজ করছে।
ইরানের বিক্ষোভে দেখা গেছে 'ফেক নিউজ' বা ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি। আর এ ধরনের ভুয়া খবরকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানি সরকারকে উৎখাত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। হারেৎস, দ্য মার্কার এবং সিটিজেন ল্যাব-এর তদন্তে ওঠে এসেছে, ইসরায়েলি 'হাসবারা' বা প্রচারণা সেল ইরানের শেষ রাজবংশের উত্তরাধিকারী রেজা পাহলভীর পক্ষে জনসমর্থন তৈরিতে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত। এছাড়া, বিবিসি বা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো গণমাধ্যমগুলো রেজা পাহলভীর মতো ব্যক্তিদের জনসমর্থন আছে বলে প্রচার চালাচ্ছে, যাদের আসলে ইরানের ভেতরে কোনো শক্ত ভিত্তি নেই।
ইরানের এ আন্দোলনটি 'স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক পরিকল্পিত একটি 'তথ্যযুদ্ধ' বা 'ডিসইনফরমেশন ক্যু'। ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে সিআইএ-এমআই৬ যেভাবে ক্যু করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা সেই আদলেই সাজানো। ইসরায়েল ইরানের জনগণের বৈধ ক্ষোভকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করছে, যা শেষ পর্যন্ত একটি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য করা ন্যায়সংগত আন্দোলনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত অন্তত আংশিকভাবে দেশের ভেতর থেকেই হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এক রেকর্ডে মোসাদ এজেন্টদের সংশ্লিষ্টতার কথাও জানা গেছে। এটি আসলেই সত্যি নাকি ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিচলিত করার জন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অংশ—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে যেভাবেই হোক, এটি পুরো বিষয়টিকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছে।
মূলত, এই আন্দোলন কোনো বিপ্লব নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাঁচা হাতে তৈরি একটি ‘তথ্য-সন্ত্রাস’ বা ‘ডিসইনফরমেশন ক্যু’। ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সিআইএ ও এমআই-৬ যেভাবে ক্যু করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা সেই আদলে তৈরি। যেখানে মার্কিনিরা সামরিক শক্তি জোগাতে পারে, আর ব্রিটিশরা 'বিবিসি পার্সিয়ান'-এর মতো প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে সরবরাহ করতে পারে ভুয়া খবর।
জনগণের এই অভ্যুত্থানটি একটি প্রকৃত ও ন্যায়সংগত কারণেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েল এখন তা কুক্ষিগত বা 'হাইজ্যাক' করার চেষ্টা করছে। যেভাবে তারা নিজেদের সামরিক রাষ্ট্র গড়ার জন্য ফিলিস্তিন দখল করেছে এবং জায়নবাদকে বৈধতা দিতে ইহুদি ধর্মকে ব্যবহার করেছে, ঠিক সেভাবেই তারা এখন অন্য একটি দেশের সামাজিক আন্দোলনকে চুরি করতে চাইছে। এর ফলে তারা যা অর্জন করেছে তা হলো—একটি জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য হওয়া বৈধ ও ন্যায়সংগত প্রতিবাদগুলোকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন করে তোলা।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামিদ দাবাসির নিবন্ধ থেকে সংক্ষেপিত ও অনূদিত