ইরান-ইসরায়েল সংঘাত

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত রিপাবলিকানরা

এ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের ফরদো ফুয়েল এনরিচম্যান্ট প্ল্যান্ট। পাহাড়ঘেরা সুরক্ষিত এ প্ল্যান্ট ভূমির ৮০ থেকে ৯০ মিটার গভীরে লুকানো। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি হামলা চালিয়ে এটি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। যদিও তারা এই প্ল্যান্টটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপের কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও বিষয়টি নিয়ে খোদ রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। একদিকে রয়েছে যুদ্ধের সমর্থক রক্ষণশীলরা, যাদের দাবি হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোয় এখনই হামলা চালাতে হবে। অন্যদিকে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) নীতির কট্টরপন্থী সমর্থকরা, যাদের দাবি হলো ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময় করা অঙ্গীকার অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অবস্থায়ই বিদেশের মাটিতে কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেয়া যাবে না।

এ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের ফরদো ফুয়েল এনরিচম্যান্ট প্ল্যান্ট। পাহাড়ঘেরা সুরক্ষিত এ প্ল্যান্ট ভূমির ৮০ থেকে ৯০ মিটার গভীরে লুকানো। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি হামলা চালিয়ে এটি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। যদিও তারা এই প্ল্যান্টটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম।

এ ধরনের সরাসরি হামলার জন্য প্রয়োজন হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর বোমা। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বম্বারই এ ধরনের বোমা পরিবহন ও হামলায় সক্ষম। এ অবস্থায় ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত করে ফেলা এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে চলতি এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘মি. ট্রাম্প রোববার সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন যে আমরা সহজেই যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু সে সম্ভাবনা তখনই বাড়বে যখন তিনি ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান সম্পন্ন করতে সহায়তা করবেন।’

এতে আরো বলা হয়, ‘যদি মি. ট্রাম্প ফরদো প্ল্যান্টের বিষয়ে সহায়তা না করেন, তাহলে ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আরো সময় প্রয়োজন হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি নিরপেক্ষ থাকে, তবে যুদ্ধ দীর্ঘতর হবে।”

যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে এয়ারবোর্ন রিফুয়েলিং ট্যাংকার সরানো শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওনা দিয়েছে যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিটজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জরুরিভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বি-২ স্টিলথ বম্বার মোতায়েন করা নেই। এর আগে গত মে মাসেই ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া বিমানঘাঁটি থেকে ছয়টি স্টিলথ বম্বার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়।

পেন্টাগনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরোর ভাষ্যমতে, ‘ট্রাম্প ফরদোয় হামলার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জড়ো করছেন। ট্যাংকার, ফাইটার, আর দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী—সব কিছু প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে তার মানে এই নয় যে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। বরং তিনি এ বিকল্পটি প্রস্তুত রাখছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ চাপ ব্যবহার করে ইরানের কাছ থেকে কি এমন কোনো বড় ধরনের ছাড় আদায় করা সম্ভব, যার ফলে হামলার কোনো প্রয়োজনই না পড়ে?’

হোয়াইট হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রিফুয়েলিং ট্যাংকার ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ইউরোপে পাঠানো হয়েছে, যাতে সেগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি অবস্থান নিতে পারে এবং ট্রাম্পের হাতে “আরো বিকল্প” থাকে।

মার্কিন সৈন্যরা ওই অঞ্চলের দিকে যত অগ্রসর হচ্ছে, ট্রাম্প ততই ইরানি সরকারের ওপর চুক্তির জন্য চাপ বাড়াচ্ছেন। সোমবার তিনি পোস্ট করেন, ‘আমি যে চুক্তিতে সই করতে বলেছিলাম, ইরানের তা সই করা উচিত ছিল। ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না।’

তবে অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণাত্মক হামলার পরিকল্পনা করছে এমন ধ্যানধারণা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে চেষ্টাই করছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সপ্তাহান্তে আমি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় অতিরিক্ত সামরিক সক্ষমতা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছি। মার্কিন সেনাদের সুরক্ষা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এবং এ সামরিক সক্ষমতা মোতায়েনের লক্ষ্য হচ্ছে যে ওই অঞ্চলে আমাদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান যাতে আরো শক্তিশালী হয়।’

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলছে যে ট্রাম্প এ সপ্তাহে তার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের আলোচনার চেষ্টা করছেন। তবে চলমান সংঘাত এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা এরই মধ্যে ট্রাম্প-সমর্থকদের বিভাজিত করে ফেলেছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্পের ঘণিষ্ঠ ও প্রভাবশালী রিপাবলিকানদের অনেকেরই দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্র যাতে আর নতুন করে বিদেশের মাটিতে যুদ্ধ করতে সৈন্য না পাঠায়। টাকার কার্লসনসহ মার্কিন রাজনীতির প্রভাবশালী অনেক বিশ্লেষকই এখন ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার সমালোচনা করে চলেছেন।

এক পডকাস্টে টাকার কার্লসন বলেন, যারা ট্রাম্পকে ইরানে বিমান হামলা বা সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য চাপ দিচ্ছেন, তারা সবাই যুদ্ধবাজ।

এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ভাষায় টাকার কার্লসনকে আক্রমণ করেন। যদিও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন টাকার কার্লসন।

তার বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কেউ একজন দয়া করে পাগলাটে টাকার কার্লসনকে বোঝাও যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না।’

ট্রাম্প প্রশাসনের এই মতবিরোধ পেন্টাগনের ভেতরেও বিদ্যমান। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পলিসি বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবিসহ আরো অনেকেরই চাওয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য নয়, ক্রমবর্ধমান চীনা হুমকির দিকে কেন্দ্রীভূত হোক যুক্তরাষ্ট্রের মনযোগ। যদিও এ বিষয়ে পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগে কোনো নীতিগত মতানৈক্য নেই।

এ বিতর্কের সিনেটর টম কটনের মতো রক্ষণশীল রিপাবলিকান এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল মাইকেল এরিক কুরিলার মতো সেনা কর্মকর্তারা ট্রাম্পের প্রতি কঠোর ইরান-বিরোধী নীতি বাস্তবায়নের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছেন বলে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাত সপ্তাহের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলেন জেনারেল কুরিলা। এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয়, হাজার হাজার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার, সাতটি ড্রোন ধ্বংস এবং দুটি যুদ্ধবিমান হারানোর পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় এ অভিযান।

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিরক্ষা পরিষদের চেয়ারম্যান মাইক রজার্স গত সপ্তাহে জেনারেল কুরিলার কাছে জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র কি পারমাণবিক অস্ত্রপ্রাপ্ত ইরানকে প্রতিরোধে ‘চূড়ান্ত শক্তি’ দিয়ে জবাব দিতে প্রস্তুত?

এর জবাবে জেনারেল কুরিলা বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত বিকল্পগুলোর বিস্তারিত তালিকা দিয়েছি।’

এদিকে কানাডায় আয়োজিত জি৭ বৈঠক থেকে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ওয়াশিংটনে ফিরে এসেছেন। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন তিনি। এর পর থেকেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনা আরো ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে বলে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে সাবেক সিনেট রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল সিএনএনকে বলেছেন, ‘এখানে যা ঘটছে তা হলো, টাকার কার্লসন আর স্টিভ ব্যাননের নেতৃত্বাধীন আইসোলেশনিস্টরা (বিদেশের মাটিতে বিরোধে জড়ানো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে রাখার নীতির সমর্থরা) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের উদ্বেগের জায়গা হলো আমরা হয়তো ইসরায়েলকে ইরানকে পরাজিত করতে সহায়তা করছি। আমি বলব, এ সপ্তাহটি আইসোলেশনিস্টদের জন্য খুব একটা ভালো সপ্তাহ যাচ্ছে না।’

গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তরিত

আরও