মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বৈশ্বিক যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সম্প্রতি তা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে। এতে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। খবর বিবিসি।
আদালতের ওই রায়ের পর ট্রাম্প নতুন করে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করবেন। এদিকে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন কাস্টমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের যে বিশেষ বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে সম্পর্কিত শুল্ক আদায় তারা বন্ধ রাখা হবে।
ভারত থেকে ইন্দোনেশিয়া এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। কারণ এসব দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মাসের পর মাস আলোচনা করেছে। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে নতুন শুল্কের হারটি এশিয়ার অনেক দেশের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে। কারণ শুরুতে অতিরিক্ত শুল্ক ধরা হয়েছিল। কিন্তু এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অ্যাডাম সামডিন বলেন, দেশগুলো আলোচনার সিদ্ধান্ত নিলেও দিনশেষে মার্কিন প্রশাসন উচ্চ হারের শুল্ক কার্যকর করার পথেই হাঁটছে। আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের কাছে মুখ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, সেগুলোতে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে ভবিষ্যতে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
তিনি মনে করেন, এশিয়ার ছোট অর্থনীতির দেশগুলো ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করার বিষয়ে সতর্ক থাকবে। কারণ সে দেশগুলোর ভবিষ্যত কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর। ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করতে বসেছে সেসব দেশ।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, চীন সবসময় একতরফা শুল্ক বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছে। এই বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না এবং সংরক্ষণবাদ কোনো সুফল বয়ে আনে না। অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার মনে করেন, এই পরিবর্তনগুলো চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সঙ্গে এই বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। চীন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্য, বোয়িং বিমান এবং অন্যান্য জিনিসপত্র কিনছে সেটি নিশ্চিত করা।
আবার জাপান সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, টোকিও এই রায়ের বিষয়বস্তু এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করবে এবং যথাযথভাবে সাড়া দেবে।
তবে দেশটির ক্ষমতাসীন দল লিব্যারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইৎসুনোরি ওনোদেরা নতুন শুল্কের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক টিভি অনুষ্ঠানে বলেন, এর প্রভাবে বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের দূরত্ব বাড়াবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী কিম জং-কোয়ান বলেছেন, যেসব শুল্ক পরিশোধ করা হয়ে গেছে, তা আর ফেরত পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কনীতির আওতায় কম্পিউটার চিপস পড়ছে না।
এর মধ্যে কম্পিউটার চিপস উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র তাইওয়ান জানিয়েছে, শুল্কের প্রভাব সীমিত মনে হলেও সরকার কড়া নজর রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও বজায় রাখবে।
এদিকে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার পর সিঙ্গাপুরের শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, তারা নতুন শুল্কের বিষয়ে দ্রুতই মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। তাদের বিশ্বাস, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স এবং জ্বালানির মতো কিছু পণ্যে এর প্রভাব পড়বে না।
গত সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়। এতে ইন্দোনেশিয়ার ওপর মার্কিন শুল্ক ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়। একইভাবে, তাইওয়ান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে মার্কিন শুল্ক ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুযোগ পেয়েছিল।
গত বছরের শেষের দিকে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ উৎপাদন নিয়ে করার চুক্তি করেছিল। মূলত যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে খনিজ সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
তবে এক সাক্ষাৎকারে জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, শুল্ক সংক্রান্ত রায়ের পর কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি। তাদের অংশীদাররাও চুক্তির প্রতি অবিচল থাকবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনেকের ধারণা, একাধারে ১৫ শতাংশ শুল্ক হারের কারণে যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরিকৃত পণ্য বা ফিনিশড গুডস রপ্তানি করে সেসব দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে । তবে যেহেতু সবার ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, এতে নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি পণ্যের দাম অনেক বাড়বে।