মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কিনা, এ প্রশ্নটি বেশ জোরালো। পরিস্থিতি বলছে, তিনি কেবল প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, বরং ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি এবং নতুন রাজনৈতিক তকমা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে চাপকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
পুরো পরিস্থিতি এখন ইঙ্গিত করছে এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও আগ্রাসী অভিযানের দিকে, যার ঘোষিত লক্ষ্য মাদক চোরাচালান মোকাবেলা হলেও অনেক বিশ্লেষক একে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
সামরিক মহড়া এবং চাপ বৃদ্ধি
ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি ও বক্তব্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড সহ অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, হাজার হাজার সৈন্য এবং এফ-৩৫ স্টিলথ জেট বিমান ক্যারিবিয়ান সাগরের দক্ষিণে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ‘বন্ধ’ ঘোষণা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একে সম্ভাব্য বিমান হামলার আগের অবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও অন্য কোনো দেশের আকাশসীমা বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা তার নেই।
গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌকা লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এতে নিহত হয়েছে অন্তত ৮৩ জন। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং আইনি পণ্ডিতরা এ হামলাগুলোকে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
এছাড়া, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে স্থল হামলা হতে পারে।
আইনি ও রাজনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা
ওয়াশিংটন ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপকে আইনি বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের কাঠামো থেকে সরে এসে এটিকে বেসরকারি একটি পক্ষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন অভিযান হিসেবে চিত্রিত করছে। ভেনেজুয়েলার সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি বোঝাতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘কার্টেল দে লস সোলস’কে বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই নামকরণ ও শ্রেণিবিভাগ ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপকে সন্ত্রাস দমন অভিযান হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। এতে কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে পারেন ট্রাম্প।
তবে সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক কার্যকলাপ মার্কিন সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। কারণ, কেবল কংগ্রেসই আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দিতে পারে।
আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ হিসেবে মাদক চোরাচালান মোকাবেলার কথা বলা হলেও, নানা তথ্য প্রমাণ করছে যে, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশের প্রধান উৎস নয়। অন্তত ফেন্টানিলের মতো মাদকের ক্ষেত্রে তো নয়-ই।
ট্রাম্পের কঠোর নীতির কারণ কী
বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের মাদুরোবিরোধী আগ্রাসী নীতির পেছনে একাধিক ভূ-রাজনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এই নীতির মূলে রয়েছে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভান্ডার এবং পশ্চিমা গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে চীন ও রুশ প্রভাবকে দুর্বল করা।
তবে ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য যে মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অবৈধভাবে অপসারণ করা এবং মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মডেল প্রতিস্থাপন করা, সে বিষয়ে বিশ্লেষকরা আগে থেকেই বলে আসছেন।
মাদুরোর শাসনকে ‘নারকো-সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ট্রাম্প। তার এ পদক্ষেপ নিজ সমর্থকদের কাছে অভিবাসন এবং অপরাধ দমনের বিষয়ে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মিশ্র ইঙ্গিত
সামরিক হুমকির তীব্রতা সত্ত্বেও, ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। ট্রাম্প গত সপ্তাহে মাদুরোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ, বিকল্প হিসেবে কূটনীতিকে এখনি বাতিল করে দেয়া যাচ্ছে না।
একজন 'বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেতার' সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি সহজ উপায়ে জীবন বাঁচাতে পারি তাহলে ভালো। আর যদি কঠিনভাবে করতে হয়, তবে সেটাও ঠিক আছে।‘ এই মন্তব্য মূলত মাদুরোর জন্য সমঝোতামূলক প্রস্থানের পথকেই নির্দেশ করছে। অন্যদিকে জিইয়ে রেখেছে সীমিত সামরিক হামলার আশঙ্কা।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই বেশ জটিল ও অস্থির। যুক্তরাষ্ট্র যেমন সম্ভাব্য হামলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলাও প্রতিরক্ষার জন্য তাদের বাহিনীকে একত্রিত করছে। দুই প্রশাসনের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান অঞ্চলটিতে জন্ম দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার।