জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে ইরান?

গত শনিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি যৌথভাবে ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়া চালু করে। এর মাধ্যমেই ইরানের ওপর জাতিসংঘের পূর্বের সব নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর হয়। দেশগুলো অভিযোগ করেছে, ইরান ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর ইরান বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। দেশটির সংসদে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি (এনপিটি) থেকে বের হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন আইনপ্রণেতা। এদিকে রিয়ালের বিনিময় হারে রেকর্ড পতন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় ইরানের অর্থনীতি আরো চাপে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স ও এপি।

গত শনিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি যৌথভাবে ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়া চালু করে। এর মাধ্যমেই ইরানের ওপর জাতিসংঘের পূর্বের সব নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর হয়। দেশগুলো অভিযোগ করেছে, ইরান ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি ভঙ্গ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শন কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে। এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর পর ইরান পরিদর্শন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর সংসদ সদস্য ইসমাইল কোসারি বলেন, ‘এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি সংসদে আলোচনা হবে এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

এদিকে স্পিকার মোহাম্মদ বাগের কালিবাফ বলেছেন, ‘যেসব দেশ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে তারা ইরানের কঠোর পাল্টা পদক্ষেপের মুখে পড়বে।’

এ ছাড়া ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যদি জনগণের অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় তবে দেশটি উপযুক্ত ও কঠোর জবাব দেবে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে আরো সংকটে ফেলেছে। এরইমধ্যে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হারে পতন ঘটেছে। এক ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ২৩ হাজার রিয়াল, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এতে মাংস, চাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি তেলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশটির জন্য বিদেশী সম্পদ জব্দ ও অস্ত্রচুক্তি স্থগিত হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হয়েছিল সেগুলো পুনর্নির্মাণ হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে নতুন করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বিশেষজ্ঞ কেলসি ডেভেনপোর্ট বলেছেন, ‘আইএইএ পরিদর্শন বন্ধ থাকায় ভুল হিসাবের ঝুঁকি বেড়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন হামলার অজুহাত খুঁজে পেতে পারে।’

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো বলেছে, নিষেধাজ্ঞা মানে কূটনীতির শেষ নয়। আলোচনার দরজা এখনো খোলা আছে। তবে ইরানকে আবার সহযোগিতা শুরু করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘কূটনীতির পথ এখনো খোলা আছে। তবে ইরানকে সরাসরি আলোচনায় আসতে হবে।’

রাশিয়া অবশ্য নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ’ বলেছে এবং জাতিসংঘ মহাসচিবকে বিষয়টি স্বীকৃতি না দিতে আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এ পদক্ষেপকে বড় অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল শুধু কূটনৈতিক চাপই নয়, এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, তেহরান কি আলোচনায় ফিরবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরো একটি সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে।

আরও