শতবর্ষী সমস্যার সমাধান করে গণিতের 'নোবেল' জিতলেন চীনের দুই শিক্ষক

একসঙ্গে দুই চীনা নাগরিকের ফিল্ডস মেডেল অর্জনের এ ঘটনা দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ওয়েইবো এবং রেডনোটের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোয় ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘ফিল্ডস মেডেলজয়ী প্রথম চীনা গণিতবিদ’ নিয়ে তৈরি কন্টেন্টগুলো এরই মধ্যে পেয়েছে কোটি ভিউ।

প্রথমবারের মতো গণিতের 'নোবেল' হিসেবে খ্যাত ফিল্ডস পদক জয়ের স্বাদ পেল চীন। একজন নয়, একসঙ্গে দেশটির দুই নাগরিক অর্জন করলেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এ সম্মাননা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এ যুগে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার অভিযাত্রায় এ অর্জনকে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছে পুরো দেশ।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, গণিতের মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কার লাভকারী দুই চীনা গণিতবিদ হলেন হং ওয়াং ও ইউ দেং। তাদের সঙ্গে যৌথভাবে ফিল্ডস মেডেলে ভূষিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জন পারডন ও কানাডার জেকন সিমারম্যান। প্রতি চার বছর পরপর ৪০ বছরের কম বয়সী মেধাবী গণিতবিদদের এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গণিতবিদদের কাছে অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের কারণে তাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এই চারজনের প্রত্যেকে ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯১ সালে চীনের গুয়াংশি অঞ্চলের গুইলিনে জন্মগ্রহণ করেন হং ওয়াং। ২০০৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে দেশটির শীর্ষস্থানীয় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুরুতে ভূ-বিজ্ঞানে ভর্তি হলেও এক বছরের মাথায় তিনি গণিত বিভাগে চলে যান।

পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে যান হং ওয়াং। সেখানে প্যারিস-সুড বিশ্ববিদ্যালয় ও একোলি পলিটেকনিকে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (এমআইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ও ফ্রান্সের 'ইনস্টিটিউট ডেস হাউটস এটিউডস সায়েন্টিফিকস'-এ অধ্যাপনা করছেন। ফিল্ডস মেডেলের ইতিহাসে তিনি তৃতীয় নারী হিসেবে এ সম্মাননা অর্জন করলেন।

সহকর্মী জশ জাহলের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় ৩৫ বছর বয়সী ওয়াং মূলত ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়ার উত্থাপিত এক জটিল জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান বের করেছেন। প্রশ্নটি ছিল—একটি পেন্সিলকে সমতলে সম্পূর্ণ ঘোরাতে সর্বনিম্ন কতটুকু জায়গার প্রয়োজন? ওয়াং ও জাহল সমস্যাটি সমতলের বদলে ত্রিমাত্রিক শূন্যস্থান বা থ্রি-ডি স্পেসে বিশ্লেষণ করে গত বছর তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতদিন পর্যন্ত ওই সমস্যার সমাধান করতে পারেননি কোনো গণিতবিদ।

পুরস্কার ঘোষণার পরপরই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো ফোন করে ওয়াংকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, ওয়াং আমাদের গবেষণা ও শিক্ষার উৎকর্ষের অন্যতম প্রতীক। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সবাইকে ফ্রান্সকে বেছে নেয়ার আহ্বানও জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

অন্যদিকে খুদে বয়সেই বিভিন্ন গণিত অলিম্পিয়াডে সাফল্য পেয়েছিলেন দেং। ২০০৭ সালে ওয়াংয়ের সঙ্গেই পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ২০০৯ সালে তিনি এমআইটিতে স্থানান্তরিত হন। পরবর্তীতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে ২০২৪ সাল থেকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন এ গণিতবিদ।

৩৭ বছর বয়সী গণিত বিভাগের অধ্যাপক ইউ দেং আরেকটি শতবর্ষী পুরনো জটিল সমস্যার সমাধান করেছেন। ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট ‘হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা’ নামে পরিচিত তত্ত্বটি উত্থাপন করেন। এতে একক কণার গতির ওপর ভিত্তি করে একটি পুরো ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বা আচরণ নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছিল। দেং গ্যাসের কণার আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে শতবর্ষী এ সমস্যার সুরাহা করেন।

একসঙ্গে দুই চীনা নাগরিকের ফিল্ডস মেডেল অর্জনের এ ঘটনা দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ওয়েইবো এবং রেডনোটের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোয় ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘ফিল্ডস মেডেলজয়ী প্রথম চীনা গণিতবিদ’ নিয়ে তৈরি কন্টেন্টগুলো এরই মধ্যে পেয়েছে কোটি ভিউ।

হং ওয়াং ও ইউ দেংয়ের এ অর্জন নিয়ে ফিল্ডস মেডেলজয়ী প্রথম জাতিগত চীনা গণিতবিদ শিং-তুং ইয়াও বলেন, চীনা গণিত গবেষণা গোষ্ঠীর জন্য এটি বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক অর্জন।

আরও