মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘এক যুগান্তকারী রায়ে’ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। গতকালের এ রায়ে স্বাধীন ফেডারেল সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্তে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের বরখাস্ত করা ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুক আপাতত পদে বহাল থাকছেন। খবর এপি।
বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগে ট্রাম্প বরখাস্ত করার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান আইনি লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত লিসা কুক তার পদে বহাল থাকতে পারবেন।
তবে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়া অন্য সব স্বাধীন সংস্থার ক্ষেত্রে আদালত বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো সংস্থাপ্রধানদের বরখাস্ত করতে পারবেন। ফেডারেল আইনে এসব পদ থেকে অপসারণের জন্য যথাযথ কারণ দেখানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া ৯১ বছর আগের এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্টের সেই ক্ষমতা সীমিত করা হলেও এখন আর সেই সীমাবদ্ধতা বহাল থাকছে না।
ছয়জন রক্ষণশীল বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দেয়া এ রায়ে আদালত ১৯৩৫ সালের সর্বসম্মত হামফ্রিস এক্সিকিউটর মামলার নজির কার্যত বাতিল করে দেন। ওই রায়ে স্বাধীন সংস্থার বোর্ড সদস্যদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টের অপসারণ ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছিল।
সাবেক ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সদস্য রেবেকা স্লটারের মামলায় এ রায় দেয়া হয়েছে। ফেডারেল আইনে কারণ দেখানো ছাড়া বরখাস্ত করা না গেলেও ট্রাম্প কোনো কারণ ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করেছিলেন।
এখন আদালতের এ যুক্তি অন্যান্য স্বাধীন সংস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল লেবার রিলেশনস বোর্ড, মেরিট সিস্টেমস প্রোটেকশন বোর্ড এবং কনজ্যুমার প্রোডাক্ট সেফটি কমিশনে। এসব সংস্থা থেকেও ট্রাম্প বোর্ড সদস্যদের বরখাস্ত করেছিলেন।
রায়ের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলোর একটি এবং একেবারেই ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন এ রায়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারা আমার জন্য বিরাট সম্মানের।
এর আগেও উদারপন্থী বিচারপতিদের আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আদালত। বিচারাধীন অবস্থাতেই স্লটার এবং অন্যান্য সংস্থার বোর্ড সদস্যদের পদ থেকে অপসারণের অনুমতি দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক জ্বালানি, পণ্যের নিরাপত্তা কিংবা শ্রম সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ন্ত্রণকারী স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি।
গত ডিসেম্বরে স্লটারের মামলার শুনানিতে ট্রাম্প মনোনীত তিন বিচারপতিসহ ছয়জন রক্ষণশীল বিচারপতির বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তারা ট্রাম্পকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে—এমন একটি সাংবিধানিক রায় দিতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।
এই অবস্থান অনেকটা ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্টের দায়মুক্তি-সংক্রান্ত মামলার সময়কার বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। ওই মামলায় ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয়ের ফল উল্টে দেয়ার চেষ্টার জন্য ফৌজদারি বিচারের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন।
তখন বিচারপতি নিল গরসাচ বলেছিলেন, আদালত এমন একটি সিদ্ধান্ত লিখছেন যা ‘যুগের পর যুগ টিকে থাকবে।’
অন্যদিকে ভিন্নমত পোষণ করে আদালত কক্ষে নিজের বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরেন বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ রায়ের ফলে ‘আনুগত্যে বাধ্য করা, অস্থিতিশীলতা এবং এমনকি নিপীড়নের’ পথ খুলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে প্রেসিডেন্ট এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই ক্ষমতা তাকে জনগণ বা সংবিধান দেয়নি; এই আদালতের ছয়জন বিচারপতি দিয়েছেন।’
লিসা কুকের মামলায় আদালত ৫-৪ ভোটে ট্রাম্প প্রশাসনের তাকে অবিলম্বে পদচ্যুত করার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ এবং তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে ছিলেন।
রবার্টস লিখেছেন, কুককে এখনই অপসারণের অনুমতি দেয়া হলে ‘প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময়, যেকোনো কারণে, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই এবং পরবর্তীতে কোনো বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ ছাড়াই ফেডারেল রিজার্ভের একজন সদস্যকে অপসারণ করতে পারবেন। এতে যথাযথ কারণ ছাড়া অপসারণ না করার যে সুরক্ষা রয়েছে, তা কার্যত সাধারণ ইচ্ছামতো চাকরিতে পরিণত হবে।’
তবে রায়ের একটি ফুটনোটে রবার্টস উল্লেখ করেন, ট্রাম্প চাইলে ‘আবারো চেষ্টা করতে’ পারবেন, তবে সে ক্ষেত্রে কুককে যথাযথ নোটিশ দিতে হবে এবং অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হবে। ট্রাম্পও ট্রুথ সোশ্যালে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি সেই পথেই এগোবেন।