সস্তা ড্রোনে বদলে যাচ্ছে আকাশযুদ্ধের ধরন

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুদ্ধ প্রযুক্তি দ্রুত বদলেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেই এর স্পষ্ট নমুনা দেখতে পেয়েছে বিশ্ব। ট্যাংক ও কামাননির্ভর যুদ্ধ ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ড্রোননির্ভর যুদ্ধে। প্রচলিত অস্ত্র ও আকাশশক্তিতে পিছিয়ে থাকায় ইউক্রেন সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি ও হামলায় সাফল্য পেয়েছে। ধারণা করা হয়, যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ড্রোন হামলার কারণে হয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে চলমান ইরান যুদ্ধেও।

আকাশ যুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছে মূলত ধনী দেশগুলো। উন্নত যুদ্ধবিমান নির্মাণ ও সেগুলো চালাতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যয় বহন করাও দেশগুলোর জন্য সহজ। বর্তমানে তাদের এ সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোন। তুলনামূলক ক্ষুদ্রায়তন ও কম সম্পদ হাতে নিয়েও অনেক বাহিনী এখন সুপারপাওয়ারগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি সাধনে সক্ষম হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুদ্ধ প্রযুক্তি দ্রুত বদলেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেই এর স্পষ্ট নমুনা দেখতে পেয়েছে বিশ্ব। ট্যাংক ও কামাননির্ভর যুদ্ধ ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ড্রোননির্ভর যুদ্ধে। প্রচলিত অস্ত্র ও আকাশশক্তিতে পিছিয়ে থাকায় ইউক্রেন সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি ও হামলায় সাফল্য পেয়েছে। ধারণা করা হয়, যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ড্রোন হামলার কারণে হয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে চলমান ইরান যুদ্ধেও।

ইরান বহু বছর ধরে তার মিত্রদের জন্য ড্রোন নির্মাণ ও সরবরাহ করে আসছে। আর এখন নিজেও তা ব্যাপক আকারে ব্যবহার করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর থেকে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ১ হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এই রণকৌশল নির্ভুলতার চেয়ে সংখ্যার ওপর নির্ভর করে বেশি। এক্ষেত্রে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এসব ড্রোন তৈরির খরচও বেশ কম। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাবে, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়।

আর এসব ড্রোন মোকাবেলা করতে গিয়ে ছোঁড়া একেকটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মূল্য প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার। সে অনুযায়ী, একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দামে ১১৫টি ওয়ানওয়ে অ্যাটাক ড্রোন তৈরি করা যায়, যার প্রতিটির গড় খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার।

সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান ড্রোন ছুঁড়েছিল ১ হাজারের বেশি। দেশটির মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালাচ্ছে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে অংশ নিচ্ছে দেশটির প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান। ব্যয় ও বিলম্বজনিত সমস্যার পর এবার প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে মার্কিন বাহিনী। রয়েছে দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমান, যা সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড নির্ভুল লক্ষ্যভেদী বোমা বহন করতে পারে। আরেকটি বড় বোমারু বিমান বি-১, যার ডাকনাম ‘বোন’। এটি সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহন করতে পারে এবং এতে ২৪টি পর্যন্ত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়। রয়েছে বড় আকারের কিছু উড়োজাহাজ, যা জ্বালানি সরবরাহ বা নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়।

এছাড়া চালকবিহীন প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রিপার’ ড্রোন, যা ভূমিস্থ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাইলটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে অনেকটা ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতো দেখতে FLM-136 LUCAS, যা মূলত ওয়ানওয়ে অ্যাটাক ড্রোন।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলো চালাতে উচ্চ প্রশিক্ষিত পাইলট প্রয়োজন। দুই আসনের একটি এফ-১৫ চালাতে বহু বছরের প্রশিক্ষণ লাগে এবং এর ব্যয়ও অনেক। এটি ভূপাতিত হলে শুধু একটি যুদ্ধবিমান নয়, তার সঙ্গে উচ্চপ্রশিক্ষিত ও দক্ষ পাইলটদেরও জীবনও হারানোর ঝুঁকি থাকে। এর বিপরীতে কম খরচের ড্রোনগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ড্রোন ধ্বংস হলেও চালকের প্রাণহানি ঘটে না এবং নতুন ড্রোন তৈরিতে ব্যয় হয় তুলনামূলক অনেক কম।

বিষয়টি এখন কৌশলগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। আক্রমণ সস্তা হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিরক্ষার খরচ আকাশচুম্বী। অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে এমন ড্রোন ধ্বংস করতে, যেগুলো তৈরিতে ব্যয় হওয়া অর্থের পরিমাণ এর অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।

THAAD বা প্যাট্রিয়টের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ ব্যাটারির খরচ ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের দামও কয়েক মিলিয়ন ডলার। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা ২০২৪ সালে মার্কিন সিনেটকে বলেছিলেন, ‘যদি আমরা ৫০ হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করি, তাহলে সেটি ভালো অর্থনৈতিক সমীকরণ নয়।’

বিষয়টি সমুদ্রেও স্পষ্ট। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে হুথিদের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ ঠেকাতে মার্কিন নৌবাহিনী প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যের অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্রুত এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। ছোট সামরিক ড্রোন দ্রুত অনুমোদন দিয়ে ব্যবহারে আনা হচ্ছে। গত বছরের জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক নির্দেশনা জারি করেছিলেন, যেখানে দ্রুত ড্রোন মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হয়।

FLM-136 LUCAS অনেকটা ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতো—একটি একমুখী আক্রমণ ব্যবস্থা, যা কম খরচে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। এই ধরনের ড্রোন এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তিতে এটিকে খুব একটা অর্জন হিসেবে দেখছেন না মার্কিন বিশেষজ্ঞরা।

সস্তা ড্রোন ঠেকাতে বিভিন্ন সেনাবাহিনী বিভিন্ন প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে—যেমন ইলেকট্রনিক জ্যামার, প্রতিরোধক ড্রোন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার অস্ত্র। এসব প্রযুক্তি তুলনামূলক কম খরচে প্রতিরক্ষা দিতে পারে, তবে এখনো সেগুলো সীমিত পরিসরে ব্যবহারযোগ্য এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। প্রযুক্তিগুলো পুরোপুরি কার্যকর ও বিস্তৃতভাবে ব্যবহারের উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত, অনেক সেনাবাহিনীকে এখনো প্রচলিত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
(রয়টার্স অবলম্বনে)

আরও