ইউক্রেনীয় সেনারা যখন রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেছিল তখন মস্কো থেকে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। ঘটনা ঘটেছিল ৬ আগস্ট আর সেদিন মধ্যরাতে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খবর প্রকাশ করেছিল যে, ইউক্রেনের একটি শহর দখল করায় রুশ সেনাদের পুরস্কার দেয়া হবে। অথচ ওইদিন সকালেই রুশ ভূখণ্ডের কুর্স্ক অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে ইউক্রেনীয় সেনারা। এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার অভ্যন্তরে সবচেয়ে বড় আক্রমণ হিসেবে। খবর রয়টার্স।
৭ আগস্ট সকালে ইউক্রেনের আক্রমণের খবরটি সামনে চলে আসে। রুশ কমান্ডার জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ ইউক্রেনে অন্য একটি যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শন করছেন এমন এক ভিডিও প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়। সেখানে রাশিয়ার পশ্চিমের কুর্স্ক অঞ্চলে যে ঘটনা ঘটছিল তা নিয়ে কোনো উদ্বেগের চিহ্নও দেখা যায়নি। অথচ এ ঘটনাই গেরাসিমভের পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে দিতে পারে এবং আড়াই বছর ধরে চলা যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।
ইউক্রেনীয় আক্রমণের প্রথমদিকেই স্থানীয় কুর্স্ক বাসিন্দাদের মধ্যে দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ বারবার তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। অবশ্য গত সপ্তাহের আগে ইউক্রেন রাশিয়ার মতো বড় একটি দেশে হামলা করতে পারে এমন ধারণা অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এ আকস্মিক অভিযান রাশিয়ার নজরদারির কার্যকারিতা এবং তাদের সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ফরাসি সামরিক বিশেষজ্ঞ ও লিয়নের আইইএসডি ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো ইয়োহান মিশেল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রুশ গোয়েন্দা তথ্য এখানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইউক্রেনের বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের সবচেয়ে কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটার কারণে মস্কো হয়তো মনে করেছিল যে কিয়েভ খুব ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নেবে না।’
রুশ পার্লামেন্ট সদস্য ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আন্দ্রেই গুরুলিয়ভ হামলার দুদিন পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইউক্রেন যে রাশিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন লক্ষণ দেখার বিষয়ে রুশ সামরিক নেতাদের প্রায় এক মাস আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবে এ সতর্কতা কেউ কানে তোলেননি।’
অবশেষে ৭ আগস্ট বিকালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান গেরাসিমভ প্রথমবারের মতো কুর্স্কের ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। অভিযানটিকে পুতিন ইউক্রেনের আরেকটি বড় উসকানি বলে মন্তব্য করেন।
গেরাসিমভ পুতিনকে টেলিভিশনের বক্তব্যে বলেন, ‘রুশ বাহিনী এক হাজার ইউক্রেনীয় সৈন্যদের একটি দলকে কুর্স্ক অঞ্চলের গভীরে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছে।’
সামরিক বিশ্লেষক মিশেল এ ঘটনায় দুটি সম্ভাব্যতার কথা বলেন। এক. গেরাসিমভ তার অধস্তনদের কাছ থেকে ভুল তথ্য পেয়েছিলেন। দুই. টিভি ক্যামেরার সামনে পুতিনকে ভালো খবর দেয়ার ব্যাপারে তিনি চাপ অনুভব করছিলেন। মিশেল বলেন, ‘রুশ কর্মকর্তারা এ ধরনের সাজানো পরিস্থিতিতে সেটাই বলেন যা তাদের বস শুনতে চান।’
এখানে লক্ষণীয় যে রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অভিযান শুরুর ১২ ঘণ্টা পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে ঘটনাটি স্বীকার করে। তবে সেখানেও কেবল আক্রমণের কথাই ছিল, সীমানা ভেঙে পড়ার কথা আসেনি।
ইউক্রেনীয় আক্রমণের পরদিন সকাল ১০টার পর প্রথমবারের মতো কুর্স্কের গভর্নর অ্যালেক্সেই স্মার্নফ এ ঘটনার কথা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু তিনি এটাও বলেন যে রুশ সেনা ও এফএসবি নিরাপত্তা পরিষেবার সীমান্তরক্ষীরা সীমান্ত লঙ্ঘন করতে ইউক্রেনীয়দের বাধা দিয়েছেন। ঘটনাটি সম্পর্কে রুশ কর্মকর্তাদের দেয়া অসংখ্য বিবৃতির মধ্যে এটাই ছিল প্রথম যা পরবর্তী সময়ে ভুল প্রমাণ হয়।
এদিকে অভিযান শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ১২ দিন। কুর্স্ক ও সুদজা অঞ্চল থেকে গণহারে পালাচ্ছে বাসিন্দারা। টেলিগ্রামে স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘অবশ্যই আমরা পালাচ্ছি। সবাই বাঁচতে চায়।’