হোয়াইট হাউজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে গতকাল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু আয়োজন অনেকটাই প্রতীকী রয়ে গেল। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো জটিল ইস্যুগুলোয় দুইপক্ষের কোনো ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত মেলেনি। খবর রয়টার্স।
দুই নেতা ও তাদের স্ত্রীদের সম্মানে এ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। অতিথিদের তালিকায় প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের আধিক্য ছিল। হোয়াইট হাউজের বাইরে একদল বিক্ষোভকারী উচ্চস্বরে ‘হংকং থেকে বের হও চীন’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। লাল গালিচা পাতা সিঁড়িতে ছবি তোলার সময় নেতারা এসব স্লোগান স্পষ্ট শুনতে পান।
নৈশভোজের টোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘দুজনই বুঝি যে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি। কিন্তু আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক টিকে আছে এবং আমরা এর চেয়ে ভালোভাবে কখনোই একে অপরের সঙ্গে চলিনি।’
এরপর ট্রাম্প নৈশভোজের অতিথিদের তার নির্মাণাধীন নতুন বলরুমের জায়গাটি ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানান। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি শি-কে হোয়াইট হাউজ কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা একটি হেলিপ্যাডও দেখিয়েছিলেন।
শি বলেন, তিনি ও ট্রাম্প গভীরভাবে আলোচনা করেছেন এবং ‘অনেক বিষয়ে অভিন্ন বোঝাপড়ায়’ পৌঁছেছেন। এর মাধ্যমে ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা’ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে কাজ করতে হবে।’ একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বৃহৎ দেশগুলোর পরস্পরের সঙ্গে চলার নতুন পদ্ধতি’ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকটি কোথায় হয়েছে, সেটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। নিউইয়র্কে যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা জড়ো হয়েছেন, তখন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ওয়াশিংটনে।
এমন এক সময় বৈঠক হলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে শুরু করা যুদ্ধ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের জনসমর্থনের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
তাইওয়ান নিয়ে আলোচনা
গতকাল বিকলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। চীনের সরকারি বার্তা সংস্থার প্রকাশিত বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো তাইওয়ান। তবে বৈঠকের নিজস্ব কোনো সারসংক্ষেপ এখনো প্রকাশ করেনি হোয়াইট হাউজ।
ধারণা করছিল, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি জানাবেন শি। মে মাসে চীন সফরের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ তিনি স্থগিত রেখেছেন। এটিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তে এশিয়ার কয়েকটি মার্কিন মিত্র দেশ এবং তার নিজ দলের কিছু রিপাবলিকানও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে তাইওয়ানের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন কমিয়ে দিতে প্রলুব্ধ হতে পারেন ট্রাম্প। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি বেইজিং।
সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘে দেয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছিলেন এবং ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দেয়ার হুমকিও দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার শির সঙ্গে তার বক্তব্যের সুর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শি-র দিকে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে কিছুটা সরে গেছে, তার প্রতিফলন দেখা গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক বনাম জাতীয় সম্পর্ক
পূর্ব এশিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউজের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এডগার কাগান বলেন, দুই নেতার বক্তব্যের পার্থক্য তাদের কৌশলের ভিন্নতা তুলে ধরছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে বর্তমানে কর্মরত কাগান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এটিকে অনেকটাই শির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে তুলে ধরছেন। আমার কাছে যেটি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তা হলো, শি অনেক বেশি সতর্ক এবং ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে বিষয়টি ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে দুই দেশের জাতীয় সম্পর্কের সঙ্গে বেশি জড়িত।’
এক দশকেরও বেশি সময় পর ওয়াশিংটনে এটি শি-র প্রথম সফর। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের মধ্যে চলতি বছর এটি দ্বিতীয় বৈঠক।
এদিকে ট্রাম্প ও শি-র বক্তব্য কোনো মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সরাসরি সম্প্রচার করেনি। হোয়াইট হাউজ সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় প্রতিবাদ হিসেবে এসব নেটওয়ার্ক সরাসরি সম্প্রচার থেকে বিরত থাকে।
গতকাল বক্তব্যে শি বলেন, দুই দেশকে ‘নিশ্চিত করতে হবে যে এআইয়ের বিকাশ সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই নিয়ে দুই দেশের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে প্রতীকী চুক্তির বাইরে বড় কোনো সমঝোতার সুযোগ সীমিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে চাপ দেয়ার বিষয়ে বেইজিং আগ্রহী—এমনও খুব কম ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে শি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যাওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার সমর্থন জানিয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় এ নৈশভোজের অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অ্যাপলের টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের মতো শীর্ষ নির্বাহীরা। এত বড় প্রযুক্তি-নির্ভর অতিথি তালিকা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শি যেসব মার্কিন প্রযুক্তিপণ্য রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে চান, সেগুলোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প সম্ভবত কঠোর নিয়ন্ত্রণই বজায় রাখবেন।