ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটের শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছেন। তবে এবারের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ক্ষমতার এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্রিকসের সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকছেন তিনি। খবর সিএনএন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শি জিনপিংয়ের অনুপস্থিতি মানে এই নয় যে, চীন ব্রিকসকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং এটি তার দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর মনোযোগ দেয়ার কৌশল হতে পারে। চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা, প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং, শির হয়ে সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানো ও ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে চীনা ডিজিটাল ও অফশোর মুদ্রার ব্যবহার প্রসারের মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে পারেন।
২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ব্রিকস শুরু হয়েছিল। পরে ২০১০ সালে জোটে যোগ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০২৪ সালে এই জোটে যুক্ত হয়েছে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইরান। জোটটি এখন ‘ব্রিকস+’ নামে পরিচিত হচ্ছে।
চীনের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সরাসরি সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ব্রাজিল আইসিসির সদস্য হওয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট সেখানে গেলে তাকে গ্রেফতারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই পুতিন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
এ অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই হচ্ছেন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নেতা, যিনি সরাসরি রিওতে এসে সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও অংশ নিচ্ছেন। নতুন সদস্যদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো রিও সফরে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ব্রিকস এখন আরো বড় হলেও এর কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি, রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য। এর ফলে একক অবস্থান নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। তিনি ব্রিকস দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক বসানোর হুমকি দিয়েছেন, বিশেষ করে যদি তারা কোনো বিকল্প আন্তর্জাতিক মুদ্রা তৈরি করতে চায় বা মার্কিন ডলারকে বাদ দিয়ে নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করতে চায়।
এ কারণে জোটভুক্ত দেশগুলো ক্রমেই ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন চালানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়া ও ইরান এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহী।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা এ বছরের সম্মেলনে যে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে—দেশগুলোর মধ্যে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে ব্যয় ও ঝুঁকি কমে, সেই সঙ্গে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ থেকেও কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়।
এ মুহূর্তে সম্মেলন থেকে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম হলেও, এটি বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সংহতি গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। চীন, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও তারা পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্য মোকাবেলার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বিশেষ করে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর দৃষ্টি এখন ব্রিকসের দিকে।