স্থূলতার বোঝায় শৈশব হারাচ্ছে লাখো শিশু

দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে একসময় প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে দেশে নগরায়নের বিস্তার, অলস জীবনযাপন এবং সস্তা ও সহজে পাওয়া প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতায় শিশু স্থূলতা এক নতুন নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিচ্ছে

চার বছর বয়সেই ইন্দোনেশিয়ার ইন্তান পারমাতাসারির ওজন দাঁড়িয়েছিল ৩৫ কেজি। মেয়ের অনবরত খাবারের আবদার ও ক্ষুধার কাছে হার মানতেন মা সিতি রুকোয়াহ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্তানের শরীর দ্রুত ভারী হতে থাকে। স্কুলের সহপাঠীদের বিদ্রূপ ও শারীরিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে ১২ বছর বয়সে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জাকার্তার দক্ষিণে বোগোর শহরের বাড়িতে চরম মানসিক হতাশা নিয়ে বন্দিজীবন কাটাতে শুরু করে সে।

ইন্তানের এ পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কোটি কোটি শিশু এখন অপুষ্টি ও স্থূলতার দ্বৈত বোঝা বহন করছে। ২০২৪ সালে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সমর্থিত এক গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে একদিকে দীর্ঘদিনের অপুষ্টি রয়ে গেছে, অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের স্থূলতার হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এর বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এখন অপুষ্টিজনিত কম ওজনের শিশুর চেয়ে স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি। গবেষণার গবেষকদের মতে, শিশুদের স্থূলতার মহামারির কেন্দ্র এখন ধীরে ধীরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে সরে যাচ্ছে, যাদের পক্ষে এ সমস্যার অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত খরচ মোকাবিলা করা কঠিন।

ইন্দোনেশিয়া, পেরু কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও আশঙ্কাজনক। দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে একসময় প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে দেশে নগরায়নের বিস্তার, অলস জীবনযাপন এবং সস্তা ও সহজে পাওয়া প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতায় শিশু স্থূলতা এক নতুন নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশ ও তানজানিয়ার মতো যেসব দেশে স্থূলতার হার আগে কম ছিল, সেখানেও এখন তা আশঙ্কাজনক গতিতে বাড়ছে। শত শত বছরের অপুষ্টির ইতিহাস পেরিয়ে হঠাৎ অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাসের এ রূপান্তরকে বিশেষজ্ঞরা ‘টাইম বোমা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

টরন্টোর হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেনের চিকিৎসক ড. জুলফিকার ভুট্টা একটি আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অসংক্রামক রোগের এই বিশাল সুনামিতে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে অর্জিত সমস্ত অগ্রগতি ভেসে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ ক্যালরি ও চিনিযুক্ত খাবার, জাঙ্ক ফুডের অনিয়ন্ত্রিত বিপণন এবং শারীরিক শ্রমের অভাবই এ সংকটের মূল কারণ। তানজানিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বাংলাদেশেও বিক্রি হওয়া প্যাকেটজাত খাবারের বড় অংশই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘স্বাস্থ্যকর’ নয়। শৈশবের এ অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনজনিত স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্বব্যাপী ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

ইন্তানের ক্ষেত্রে অবশ্য নোভো নরডিস্কের ওজন কমানোর ওষুধ ‘ওজেম্পিক’ এবং কঠোর খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ওজন ৪০ কেজির মতো কমেছে। ১৫ বছর বয়সে সে আবার স্কুলে ফিরেছে এবং ভবিষ্যতে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উচ্চমূল্য ও সীমিত উৎপাদনের কারণে ধনী দেশগুলোর বাইরে ওজন কমানোর আধুনিক এ ওষুধ সাধারণ শিশুদের নাগালের বাইরে।

বিশ্বব্যাপী এ পুষ্টিগত রূপান্তর মোকাবিলায় কেবল ব্যক্তি সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। খাদ্যপণ্যে স্পষ্ট পুষ্টিগুণ লেবেলিং, অস্বাস্থ্যকর পানীয়ের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে পুষ্টিকর খাবারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন করা জরুরি। শৈশবকে স্থূলতা ও কটূক্তির অভিশাপ থেকে বাঁচাতে হলে বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় নীতি নির্ধারকদেরও এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রয়টার্স অবলম্বনে

আরও