অপহৃত হওয়ার আগে ভেনিজুয়েলা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতিআগ্রহের কারণ হিসেবে নিকোলাস মাদুরো বলেছিলেন, গোটা বিষয়টিই ঘটছে জ্বালানি তেলকে ঘিরে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারাকাসে হামলা ও মাদুরোর অপহরণের কারণ শুধু জ্বালানি তেল নয়। এটি ঠিক যে, বিপুল জ্বালানি সম্পদের উপস্থিতি ভেনিজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। কারণ ভেনিজুয়েলার প্রধান রফতানি পণ্য যদি কলা হতো, তাহলে হয়তো এমন কিছু ঘটত না। কিন্তু ট্রাম্পের পদক্ষেপের সময় ও এর ব্যাপকতা বুঝতে গেলে বিষয়টিকে শুধু জ্বালানি তেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল অত্যন্ত ভারী। এর উত্তোলন ব্যয়বহুল। এটি বাজার উপযোগী করার কাজটিও অনেক সময়সাপেক্ষ। মার্কিন জ্বালানি ব্যবস্থায় এটি তাৎক্ষণিকভাবে আমূল কোনো পরিবর্তন আনবে না। আবার মার্কিন যেসব পরিশোধনাগার বছরের পর বছর ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে গেছে বা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে; পণ্যটির সরবরাহ তাদের জন্যও খুব একটা গেম চেঞ্জারের কাজ করবে না।
বরং এক্ষেত্রে জ্বালানি তেলকে দেখা যায় এমন এক পুরস্কার বা প্রণোদনা হিসেবে, যার চারপাশে অন্যান্য এজেন্ডা একত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফার পথ তৈরি করা; জ্বালানি তেলের দামে কিছুটা নিম্নমুখী চাপ তৈরি করা, যুক্তরাষ্ট্রের আঙিনায় চীনের গুরুত্বপূর্ণ এক মিত্রদেশকে দুর্বল করে দেয়া, কিউবার ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন এক বার্তা দেয়া। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাপ্তির মাত্রা তুলনামূলকভাবে সামান্য। কিন্তু এগুলোকে সম্মিলিতভাবে দেখা হয়, তাহলে তাতে ট্রাম্পের এই ‘হাইপ্রোফাইল, নাটকীয় ও বেআইনি হস্তক্ষেপের’ যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। এমনকি এর অর্থনৈতিক প্রণোদনা যদি সামান্যও হয়।
ভেনিজুয়েলার জন্য এ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের উপস্থিতি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও। ১৯২০-এর দশক থেকে জ্বালানি তেলভিত্তিক আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতি দেশটির মুদ্রার অতিমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে করে তুলেছে আমদানিনির্ভর। ষাটের দশকে ভোটের অংশীদারিত্ব অনুযায়ী হাইড্রোকার্বনের মুনাফা বণ্টনের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা এ ক্ষতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জ্বালানি তেলের বাজার ধসে কারাকাস ভয়াবহ এক ঝুঁকিতে পড়ে যায়। এ ধাক্কাই উগো চাভেজ নামে তরুণ এক সামরিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করে।
ওই ঘটনার ছয় বছর পর শাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং জ্বালানি তেল সম্পদ ব্যবহার করে জাতীয় অর্থনীতিতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিরসনের অঙ্গীকার করেন। এ বছর যেন ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ২০০২ সালে বুশ প্রশাসন গোপনে ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে চাভেজবিরোধী একটি অভ্যুত্থানকে সমর্থন জানায়। এতে চাভেজ অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন ঠিকই। সে সময় গঠিত ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে দেয় এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জ্বালানি তেল খাতের সংস্কার প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ব্যাপক গণবিক্ষোভে চাভেজ ফিরে আসেন। এ ঘটনা ছিল রূপান্তরমূলক। এটি কারাকাসের শাসনব্যবস্থাকে আরো কঠোর করে তোলে এবং একটি আদর্শবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করে। রাজনৈতিক বিরোধিতাকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখা হতে থাকে। জ্বালানি তেলের অর্থ ব্যবহার করে পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক গঠন ও সামরিক সমর্থন নিশ্চিত করা হয়।
২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর এক বছর পর যখন জ্বালানি তেলের বাজার ধসে পড়ে, তখন তার সঙ্গে ভেঙে পড়ে ভেনিজুয়েলাও। রিজার্ভ থেকে ডলার উধাও হয়ে যায়। খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দেয়। জীবনমান নেমে আসে তলানিতে। দেশত্যাগ করে যায় আট মিলিয়ন মানুষ। অর্থ ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণের প্রয়াস নেন মাদুরো। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় এর ফল হয় লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। এরপর আসে নানা খাপছাড়া সমাধান। আর দুর্নীতি ফুলে-ফেঁপে ওঠে। “জনগণের নেতা” হিসেবে মাদুরোর ভাবমূর্তি এবং সম্পদের ক্রমবর্ধমান ব্যবধানে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে ওঠে শাসনের বৈধতা। কিন্তু মাদুরোকে সরালেই ব্যবস্থা বদলে যায় না। চাভিসমো ব্যবস্থার (উগো চাভেজের রাজনৈতিক দর্শন) বাইরে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেনো, উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হাতে পাবেন, যার ওপর তার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা এখনো চাভিসমোর অনুসারী ও জেনারেলদের নেটওয়ার্কের হাতেই। সেক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলার দায়িত্বে ট্রাম্প যদি মাদুরোর ডেপুটি দেলসি রদ্রিগেজকে রেখে দেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার মন্দাকে আরো তীব্র করেছে। কিন্তু শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই প্রবৃদ্ধি ফিরবে না। দেশটির শিল্পভিত্তি ফাঁপা। দক্ষ শ্রমশক্তি দেশ ছেড়েছে। মার্কিন জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো রাজস্বের বড় অংশ নিয়ে নেয়, তাহলে কারাকাস আগের চেয়েও বেশি নগদ সংকটে পড়বে। এক্ষেত্রে ইরাকের বিষয়টি স্মরণীয়। তবে ভেনিজুয়েলা যে আরেকটি ইরাক হতে যাচ্ছে, তা নয়। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেয়ার ধরনের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। কারাকাস নিয়ে কোনো একক যুক্তিকেই নির্ণায়ক বলা চলে না। এখানে জ্বালানি তেল, মাদক, আদর্শগত মোহ এবং প্রেসিডেন্টের অহম—সবই ভূমিকা রেখেছে। একেকটি আলাদাভাবে যথেষ্ট ছিল না। বরং এগুলো একসঙ্গে ট্রাম্পকে স্পষ্ট কোনো শেষপরিণতি ছাড়াই একটি উচ্চঝুঁকির সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছে।
[দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত]