ইন্দোনেশিয়ার আকাশে ঘুড়ির কারণে বিপদে উড়োজাহাজ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

সাত বছর বয়সী আতিফ বলেন, ‘আগে পুলিশ আসলে আমরা পালিয়ে যেতাম। এখন একটু সাহসী হয়েছি, বকা খেয়ে ঘুড়ি ছেড়ে দিই। ঘুড়ি নষ্ট হলে কষ্ট হয়, কিন্তু আবার বানিয়ে নিই।‘

এই ভয় শুধু আশঙ্কা নয়, বাস্তবও হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, বালিতে একটি হেলিকপ্টার ঘুড়ির সুতোয় জড়িয়ে বিধ্বস্ত হয়। আহত হন তিন ইন্দোনেশীয় ও দুই অস্ট্রেলীয়। এছাড়া, ২০২০ সালের জুলাইয়ে, একটি বিমানের ইঞ্জিনে পাওয়া যায় ঘুড়ির কাঠি ও সুতো।

ইন্দোনেশিয়ার সোয়েকার্নো-হাট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে এক ধানক্ষেতে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এক টানাপোড়েন। প্লেনের গর্জনের মাঝে উড়ছে রঙিন ঘুড়ি, আর শিশুদের দৌড়ঝাঁপ চলছে পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য।

সাত বছর বয়সী আতিফ বলেন, ‘আগে পুলিশ আসলে আমরা পালিয়ে যেতাম। এখন একটু সাহসী হয়েছি, বকা খেয়ে ঘুড়ি ছেড়ে দিই। ঘুড়ি নষ্ট হলে কষ্ট হয়, কিন্তু আবার বানিয়ে নিই।‘

এই দৃশ্য এখন ইন্দোনেশিয়ার বহু জায়গায় দেখা যায়—একদিকে জনপ্রিয় ঘুড়ি উৎসব, অন্যদিকে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ।

জুলাইয়ের শুরুতে মাত্র তিন দিনে ২১টি ফ্লাইট ঘুড়ির কারণে ব্যাহত হয়েছে বলে জানায় ইন্দোনেশিয়ার এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এয়ারন্যাভ ইন্দোনেশিয়া। কিছু ফ্লাইট গন্তব্য বদলাতে বাধ্য হয়, আর কিছু অবতরণই বাতিল করে। কারণ ঘুড়ি প্লেনের সেন্সর বা ইঞ্জিনে আটকে যেতে পারে, যা বিপজ্জনক।

সোয়েকার্নো-হাট্টা বিমানবন্দরের প্রধান কর্মকর্তা পুতু একা চাহিয়াদি বলেন, ‘ঘুড়ি হলো এক ধরনের চলমান বাধা, যা উড়োজাহাজের জন্য ভয়ানক ঝুঁকি। আমরা কোনো দুর্ঘটনা চাই না।‘

এই ভয় শুধু আশঙ্কা নয়, বাস্তবও হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, বালিতে একটি হেলিকপ্টার ঘুড়ির সুতোয় জড়িয়ে বিধ্বস্ত হয়। আহত হন তিন ইন্দোনেশীয় ও দুই অস্ট্রেলীয়। এছাড়া, ২০২০ সালের জুলাইয়ে, একটি বিমানের ইঞ্জিনে পাওয়া যায় ঘুড়ির কাঠি ও সুতো। প্লেনটি অবতরণ করতে পারলেও বিষয়টি ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক উদ্বেগ।

এরপর থেকে বিমানবন্দর এলাকায় ঘুড়ি ওড়ানো বন্ধে অভিযান চালানো শুরু হয়, কিন্তু পাঁচ বছর পরেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। দেশটির পরিবহন মন্ত্রী দুদি পুরওয়াগান্ধি সম্প্রতি দেশজুড়ে আঞ্চলিক প্রশাসনকে আহ্বান জানান, যেন ঘুড়ির কারণে বিমান চলাচলে বাধা না পড়ে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুদের হাতে ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট তুলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে বিকল্প খেলাধুলার উৎসাহ দিতে। কিন্তু ঘুড়ি ওড়ানো যেন ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়া কাইট মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ আসেপ ইরাওয়ান বলেন, ‘ঘুড়ি ওড়ানো আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য। প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই ঘুড়ির নিজস্ব ইতিহাস ও রীতি রয়েছে।‘ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘শিশুরা শুধু আনন্দের জন্য ঘুড়ি ওড়ায়, কিন্তু এর ঝুঁকি তারা বোঝে না।‘

বিমানবন্দরের আশপাশে ঘুড়ি, ড্রোন বা যে কোনো উড়ন্ত বস্তু ওড়ানোর অপরাধে তিন বছরের জেল বা ১০০ কোটি ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ (৬১,০০০ ডলার) জরিমানা হতে পারে। তবু বিপদ শুধু বিমানের নয়—শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও ঘুড়ি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে জাকার্তার দক্ষিণে ডিপক শহরে একটি টোল রোডে ঘুড়ি ধরতে গিয়ে আট বছর বয়সী এক শিশু গাড়ির ধাক্কায় মারা যায়। একই বছর বালিতে একটি ঘুড়ি উড়ে গিয়ে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে পড়ে। ফলে প্রায় ৭০ হাজার ঘর ও প্রতিষ্ঠানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।

বিমানবন্দর সংলগ্ন ধানক্ষেতটি এখন হয়ে উঠেছে স্থানীয় ঘুড়িপ্রেমীদের মিলনস্থল। সেখানে নিয়মিত প্রতিযোগিতা হয়, আর কিশোর রাশা দুইবার জিতেছে সেই প্রতিযোগিতায়। ১৭ বছর বয়সী রাশা বলে, ‘আমার ঘুড়ি পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি আমাদের বাড়িতেও এসেছিল তারা, দুইটা ঘুড়ি জব্দ করে পুড়িয়ে দিয়েছে। ভাই-বোনেরা বকা দিল, আমি ঘুড়ি ওড়ানো ছেড়ে দিই তখন। এখন আবার শুরু করেছি। জানি এটা বিপজ্জনক। কিন্তু একবার ঘুড়ি চলে গেলে ভয়ও কেটে যায়।‘

শহর জুড়ে খোলা জায়গার অভাবের কারণেই শিশু-কিশোররা বিকল্প খেলার জায়গা খুঁজে পায় না। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জাকার্তার ৩১% সবুজ এলাকা হারিয়ে গেছে। তাই রাশার মতো অনেকের জন্য এই ধানক্ষেতই শেষ আশ্রয়।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও