অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে দুটি বড় ধরনের অবৈধ বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ পদক্ষেপ একটি অখণ্ড ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের আশার ওপর ‘চূড়ান্ত আঘাত’ হিসেবে কাজ করবে।
রোববার জেরুজালেম গভর্নরেট জানিয়েছে, ঐতিহাসিক কালান্দিয়া বিমানবন্দর (আতারোত) এলাকায় ৯ হাজার নতুন বসতি ইউনিট ও শেখ জাররাহ এলাকায় পৃথক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে পরিকল্পনা চলছে। খুব শিগগিরই পরিকল্পনা দুটি অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। শেখ জাররাহ প্রকল্পের মাধ্যমে সেখান থেকে ৪০টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অবৈধ ইসরায়েলি বসতি বিশেষজ্ঞ সুহেল খালিলিয়ে আল জাজিরাকে জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আতারোত প্রকল্পটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এটি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে।
খালিলিয়ে বলেন, নেতানিয়াহু-ট্রাম্প বৈঠকটি বসতি সম্প্রসারণের জন্য একটি ‘সবুজ সংকেত’ হিসেবে কাজ করেছে। জেরুজালেমকে আলোচনার বাইরে রাখার মার্কিন অবস্থান ইসরায়েলকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উৎসাহিত করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা এখন কেবল মৌখিক আপত্তিতে সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ নেই।
খালিলিয়ের মতে, ‘গ্রেটার জেরুজালেম’ বা বৃহত্তর জেরুজালেম ভিশন সম্পন্ন করার জন্য তিনটি প্রধান অক্ষ বা রুট পরিকল্পিত হয়েছে। সেগুলো হলো:
- উত্তর: আতারোত প্রকল্পের মাধ্যমে পূর্ব জেরুজালেমকে গিভাত জেভ বসতি ব্লকের সাথে যুক্ত করা হবে, যা কার্যত জেরুজালেম শহরকে রামাল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
- পূর্ব: ই-১ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো পূর্ব জেরুজালেম ও মালে আদুমিম ব্লকের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা।
- দক্ষিণ: হার গিলো ও নতুন নাহাল হেলেৎজ বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শহরটিকে গুশ এতজিয়ন ব্লকের সাথে সংযুক্ত করা হবে।
এ প্রকল্পের ফলে জেরুজালেমের আয়তন আরো ১৭৫ বর্গকিলোমিটার বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে পূর্ব জেরুজালেমের আয়তন ৭১ বর্গকিলোমিটার। এ সংযোজনগুলোর ফলে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর জেরুজালেমের আয়তন হবে ২৪৬ বর্গকিলোমিটার, যা পশ্চিম তীরের মোট আয়তনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মূল লক্ষ্য হলো পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা।
খালিলিয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘নগর পুনর্গঠন’ -এর মতো নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করে মূলত জোরপূর্বক উচ্ছেদ নীতি আড়াল করছে ইসরায়েল। ২০২৫ সালেই পূর্ব জেরুজালেমে তিন শতাধিক ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ‘আর্নোনা’ বা সম্পত্তি করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জেরুজালেম ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। অবহেলিত ফিলিস্তিনি পাড়ার বাসিন্দাদের এখন অভিজাত ইসরায়েলি এলাকার সমান চড়া হারে কর দিতে হচ্ছে, যা তাদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটি একটি ‘নীরব উচ্ছেদ’ প্রক্রিয়া।
খালিলিয়ে জোর দিয়ে বলেন, আইনি ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ অবশ্যই নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার আগে করতে হবে। কারণ একবার বসতি তৈরি হয়ে গেলে তা রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তন করা অসম্ভব। আর এজন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ও এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান জানান তিনি।