হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর ইরানে একাধিক দফায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটির ওপর হামলা চালিয়েছে তেহরান। খবর আল জাজিরা।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, গতকাল রাতে দক্ষিণ ইরানে শুরু হওয়া হামলাগুলো ছিল ‘অযৌক্তিক ইরানি আগ্রাসনের প্রতি আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, হামলার প্রথম দফায় গতকাল রাতে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ, সিরিক ও জাস্ক বন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মধ্য রাতের পর জাস্ক ও বন্দর আব্বাসে আরো বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে টহলরত একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইরান ভূপাতিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, হামলার জবাব দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অপরিহার্য’ হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প জানান, হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা আহত হননি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের কাছাকাছি বিদেশী সামরিক বাহিনী সব সময় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ইরানি বাহিনী কোনো হামলা বা হুমকির জবাব ছাড়া থাকবে না। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যান।
এসব ঘটনা দুই মাস আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো সোমবার ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, ইসরায়েলি হামলায় দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটের অন্তত দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক অ্যালান ফিশার জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ধারণা অনুযায়ী, ওমান উপকূলের কাছে একটি ইরানি শাহেদ ড্রোনের আঘাতে হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হয়। ঘটনার পর একটি চালকবিহীন ড্রোন নৌযান পাঠিয়ে দুই পাইলটকে দুই ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ ভাল জানান, মার্কিন হামলার ফলে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার কিছু প্রস্তাব এখনো ইরানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। তবুও তেহরানের অভিযোগ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবেশ নষ্ট করছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ ভোরে এক ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো নাগরিকদের আতঙ্কিত না হওয়ার এবং কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করছে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের বিমান বাহিনী জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা সদস্যরা অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়। আইআরজিসির দাবি, হামলায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে।
আইআরজিসি আরো দাবি করেছে, এটি ছিল বৃহত্তর প্রতিশোধমূলক অভিযানের অংশ, যার আওতায় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটিতে ২১টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের জবাবে তারা ‘চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী’ প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।