আটলান্টিক মহাসাগরে একটি ক্রুজ জাহাজে বিরল হান্টাভাইরাসের সন্দেহভাজন প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ দম্পতিও রয়েছেন। এছাড়া অন্তত আরো তিনজন অসুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগ। খবর এপি।
ডব্লিউএইচও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং অন্তত একটি ক্ষেত্রে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। জাতিসংঘের সংস্থাটি জানায়, আক্রান্তদের একজন দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। এছাড়া উপসর্গ থাকা আরো দুই যাত্রীকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে তারা।
হান্টাভাইরাস বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায় এবং সাধারণত ইঁদুর বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর প্রস্রাব বা মলের সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর ভাইরাসটি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর হার্টের রোগে নিজ বাড়িতে মারা যান জিন হ্যাকম্যান।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, হান্টাভাইরাস গুরুতর শ্বাসযন্ত্রজনিত অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজেস কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) অনুযায়ী, এ ভাইরাস থেকে ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ নামে মারাত্মক ও অনেক সময় প্রাণঘাতী ফুসফুসের সংক্রমণ হতে পারে।
এমন ঘটনা বিরল হলেও ডব্লিউএইচও বলছে, কিছু ক্ষেত্রে হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে।
সংস্থাটি জানায়, আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলরত একটি ক্রুজ জাহাজকে ঘিরে একটি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ডব্লিউএইচও অবগত এবং সহায়তা দিচ্ছে। বিস্তারিত তদন্ত চলছে, যার মধ্যে রয়েছে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও মহামারিবিদ্যাগত অনুসন্ধান। যাত্রী ও ক্রুদের চিকিৎসা ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে এবং ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণও চলছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাবটি ঘটেছে এমভি হোন্ডিয়াস নামের ক্রুজ শিপে। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা জাহাজটি অ্যান্টার্কটিকা, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার পথে ছিল।
গ্লোবাল শিপিং ওয়েবসাইট মেরিন ট্র্যাফিক অনুযায়ী, ডাচ পতাকাবাহী যাত্রীবাহী জাহাজটি রোববার রাতে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী দেশ কেপ ভার্দের রাজধানী প্রাইয়াতে নোঙর করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, প্রথম নিহত ব্যক্তি ছিলেন ৭০ বছর বয়সী এক পুরুষ, যিনি জাহাজেই মারা যান। পরে দক্ষিণ আটলান্টিকের ব্রিটিশ অঞ্চল সেন্ট হেলেনায় মরদেহ নামানো হয়। তার স্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বিমানবন্দর থেকে নিজ দেশে নেদারল্যান্ডসে ফেরার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে নিকটবর্তী হাসপাতালে মারা যান।
জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, সেন্ট হেলেনা ছাড়ার পর অ্যাসেনশন দ্বীপের কাছে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখান থেকে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানান্তর করা হয়।
প্রাদুর্ভাবের সময় জাহাজটিতে প্রায় ১৫০ জন পর্যটক ছিলেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিভিন্ন অনলাইন ট্যুর অপারেটরের তথ্যানুযায়ী, বিশেষায়িত পোলার ক্রুজ জাহাজটিতে সাধারণত প্রায় ৭০ জন ক্রু সদস্য থাকেন।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ ও জাহাজ পরিচালনাকারীদের সঙ্গে মিলে পূর্ণাঙ্গ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে এবং জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস জোহানেসবার্গ অঞ্চলে ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’ চালাচ্ছে, যাতে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা অন্যদের শনাক্ত করা যায়।
হান্টাভাইরাস সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা প্রতিকার নেই। তবে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।