বিবিসি

জ্বালানি তেল, প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি: যেসব কারণে ভারত সফরে পুতিন

বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মূলত তেলনির্ভর; মোদি চাইছেন সম্পর্ককে আরো বৈচিত্র্যময় করতে।

ট্রাম্পের মেয়াদে ভারত–মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মাঝেই পুতিনকে স্বাগত জানানো দিল্লির কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার বড় পরীক্ষা। ইউরোপও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কাছ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আশা করছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দিনের সফরে দিল্লিতে পৌঁছেছেন। এ সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও দুই দেশের আয়োজনে বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন। তেল, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে দিক নির্দেশনা পেতে চলেছে।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ভারতের মোট জ্বালানি তেল আমদানির মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল রুশ উৎস থেকে; পরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ শতাংশে। তবে মার্কিন চাপ ও নতুন শুল্ক আরোপের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত রুশ তেল আমদানি কমিয়েছে। পুতিনের লক্ষ্য—ভারতের বাজার ধরে রাখা।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার 'শাস্তি' হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যা মোট শুল্ককে ৫০ শতাংশে দাঁড় করিয়েছে। এর ফলে মে থেকে অক্টোবর ২০২৫-এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রফতানি ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে জেম, জুয়েলারি এবং টেক্সটাইল-এর মতো শ্রমঘনিষ্ঠ শিল্পগুলোতে।

মার্কিন শুল্কের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পুতিন ভারতকে কৃষি ও ফার্মাসিউটিক্যালস-সহ অন্যান্য পণ্য আরো বেশি পরিমাণে কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মোদি এই সফরে সেই বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর কৌশল খুঁজছেন।

প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ভারত দীর্ঘদিন ধরে রুশ গ্রাহক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি কমেছে। তবুও ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহু স্কোয়াড্রন এখনো রুশ প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্ত সংঘর্ষে রুশ এস-৪০০ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ভারতের কাছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন এস-৫০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও এসইউ-৫৭ ফাইটার জেট কেনা নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে। যদিও রাশিয়া নিজেই যুদ্ধজনিত কারণে উৎপাদন সংকটে রয়েছে।

বাণিজ্যে রাশিয়ার উদ্বৃত্ত কমাতে ভারত চায় রুশ বাজারে নিজস্ব পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মূলত তেলনির্ভর; মোদি চাইছেন সম্পর্ককে আরো বৈচিত্র্যময় করতে।

এ সফর মোদির জন্য কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে ভারত–মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মাঝেই পুতিনকে স্বাগত জানানো দিল্লির কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার বড় পরীক্ষা। ইউরোপও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কাছ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আশা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যেখানে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বও অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। পুতিনের দিল্লি সফর তাই ভারতের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’র বাস্তব পরীক্ষা।

আরও