শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারীরা, সময় চেয়েছে মোদি সরকার

ভারতের জাতীয় মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

সরকারের সঙ্গে গতকাল তৃতীয় দফা বৈঠকেও এ দাবি থেকে সরে আসেননি আন্দোলনের নেতারা। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে সিজেপি। দাবি মানা না হলে দেশব্যাপী নতুন ও বৃহত্তর আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে শনিবার (আজ) বিকাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলন ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে।

গতকাল নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জীতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে প্রায় ২ ঘণ্টা বৈঠক করেন সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বৈঠকের পর আন্দোলনকারীরা জানান, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া কোনো সমাধান তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এ দাবিতে সরকারের জবাবের জন্য শনিবার বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন তারা।

আশুতোষ রাঙ্কা সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে জবাব দিতে সরকার আগামীকাল বিকাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে। আমরা আশা করছি, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করবে অথবা তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন, যাতে এ সংকটের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়।’

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বৈঠককে সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, আন্দোলনকারীরা তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছেন এবং এসব দাবি নিয়ে শনিবার আবার আলোচনা হবে। আন্দোলনকারীদের অন্য দুই দাবি হলো বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া।

সিজেপি নেতাদের দাবি, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে পাঁচ দফা প্রস্তাবও সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকের পর যন্তর মন্তরে সমবেত বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে যেসব শিক্ষার্থী জীবন হারিয়েছে, তাদের মৃত্যুর দায় সরকারকে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘পুরো দেশ একমত যে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে। এর কমে আমাদের কোনো কাজ হবে না।’ তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত তরুণদের ধৈর্যের পরীক্ষা না নেয়া। এক থেকে দুদিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ২০ জুলাইয়ের সংসদ অভিমুখী মিছিলের চেয়েও বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

অবশ্য ভারতীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন না। সরকারের দাবি, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত একাধিক চক্র ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আরো অভিযান চলবে বলেও সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

একই দিনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শাস্তি আরো কঠোর করার একটি খসড়া আইন অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সংগঠিতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, নতুন আইন বা শাস্তি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, রাজনৈতিক দায় স্বীকারের অংশ হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অপরিহার্য।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে এক ভিডিও বার্তায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি নেতারা বলেন, সরকার সবচেয়ে কঠোর যে ব্যবস্থা নিতে পারে, তা হলো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেয়া।

গতকালও দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান করেন। আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। কলকাতায় বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কয়েক হাজার মানুষ তিরঙ্গা মিছিলে অংশ নেন। হায়দরাবাদে শিক্ষার্থীরা শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিল করেন।

বিক্ষোভের কারণে গতকালও দিল্লির কেন্দ্রস্থলের ১৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের মেয়াদও বাড়ানো হয়। নিরাপত্তার নামে বিক্ষোভস্থলে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ও মোবাইল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল যান ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে সরকারের কাছ থেকে পরীক্ষা সংস্কার ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষার আশ্বাস পাওয়ার পর অনশন ভেঙেছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তবে সিজেপি জানিয়েছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরের অবস্থান কর্মসূচি এবং দেশব্যাপী আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন মে মাসে নিট পরীক্ষা বাতিলের পর দ্রুত বিস্তৃত হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আন্দোলনটি লাখ লাখ তরুণের সমর্থন পায়। বর্তমানে এ আন্দোলনকে ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বড় যুব-অসন্তোষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও