সিএনএনের বিশ্লেষণ

লারিজানি হত্যাকাণ্ড কি দীর্ঘায়িত করবে ইরান যুদ্ধ?

লারিজানি দশকের পর দশক ধরে সিস্টেমের কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন, যা তাকে বিভিন্ন অংশের উচ্চপদস্থদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লারিজানি ছিলেন ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের প্রধান স্থপতি। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই বিদায় কেবল একটি শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং যুদ্ধ থামানোর যেকোনো ভবিষ্যৎ আলোচনাকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং বর্তমান সংকটের নেপথ্য কারিগর আলী লারিজানির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এক নতুন ও জটিল মোড় নিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লারিজানি ছিলেন ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের প্রধান স্থপতি। বিশ্লেষকদের মতে, তার এই বিদায় কেবল একটি শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং যুদ্ধ থামানোর যেকোনো ভবিষ্যৎ আলোচনাকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ছিলেন ইরানি শাসনব্যবস্থার এক অবিচল প্রতীক। গত সপ্তাহেও তেহরানের এক জনসভায় তাকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে, যদিও তিনি শুরু থেকেই ইসরায়েলের 'হিট লিস্টে'র শীর্ষে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি তুচ্ছজ্ঞান করা এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে দেওয়া লারিজানি ছিলেন একাধারে তুখোড় বক্তা ও দূরদর্শী নেতা। পারস্য উপসাগরের মুসলিমদের সতর্ক করেছিলে, ‘আপনারা জানেন, আমেরিকা আপনাদের প্রতি বিশ্বস্ত নয়, আর ইসরায়েল আপনার শত্রু। এক মুহূর্ত থামুন, নিজেরা এবং অঞ্চলের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবুন।‘

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানি কার্যত ইরানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে উঠেছিলেন। জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজির মতে, লারিজানি ছিলেন এক সত্যিকারের 'ভেতরের লোক', যিনি দশকের পর দশক ধরে সিস্টেমের কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন, যা তাকে বিভিন্ন অংশের উচ্চপদস্থদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ব্যক্তিবিশেষের ক্ষতি সহ্য করার জন্য তৈরি হলেও, এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় না।

একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র সিএনএনকে বলেছেন, সেপ্টেম্বর ২০২২-এ লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে ‘পছন্দসই মধ্যস্থতাকারী’ ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিবাদকারীদের দমন, মার্কিন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখরোচক পদক্ষেপ এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়ার পর ইসরায়েল তার দিকে লক্ষ্য রেখেছিল।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তার মৃত্যুতে যুদ্ধ পরিচালনায় তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হলেও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে উঠবে। কারণ তিনি ইরানের রাজনৈতিক বার্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আজিজির মতে, সংঘাত শুরুর পর থেকেই কার্যত ‘সাইডলাইনড’ হয়ে যাওয়া মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো একজন মধ্যপন্থী এখন দলের ভেতরকার সমন্বয় করতে পারবেন না। সম্ভাব্য চুক্তি করার জন্য লারিজানির মতো একজন শক্তিশালী নেতা দরকার। ইসলামী প্রজাতন্ত্রে এই ধরনের প্রোফাইল বিরল। একমাত্র পদ যা তার রেজ্যুমেতে নেই তা হলো প্রেসিডেন্ট।

প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে লারিজানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। শরীফ ইউনিভার্সিটি থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করা এই নেতার দর্শনেও ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য; বিশেষ করে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর তার গবেষণা ছিল সুবিদিত। তার মৃত্যুতে ইরানের নেতৃত্ব এখন আরো বেশি সামরিকীকরণ ও রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহসেন রেজায়ির মতো কট্টরপন্থী সাবেক কমান্ডারদের উত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লারিজানির সেই 'প্র্যাগম্যাটিক' বা বাস্তববাদী কূটনীতির জায়গা এখন কেবলই বারুদের গন্ধে ঢাকা পড়ে যাবে।

আরও