স্থাপন করা হচ্ছে একের পর এক ডাটা সেন্টার ক্লাস্টার

এআই সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান ঘোঁচাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে চীন

প্রযুক্তি খাতে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশ পিছিয়ে চীন। গবেষণা সংস্থা ইপক এআইয়ের হিসাবে, বর্তমানে বৈশ্বিক কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। আর চীনের নিয়ন্ত্রণে আছে প্রায় ১৫ শতাংশ। দুই দেশের সক্ষমতায় এমন দূরত্ব ঘোঁচানোর উদ্দেশ্য থেকেই এমন পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে বেইজিং।

চীনের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় আনহুই প্রদেশের উহু (Wuhu) শহর। এখানে ইয়াংসি নদীতে অবস্থিত ৭৬০ একর আয়তনের একটি দ্বীপে গড়ে তোলা হচ্ছে বেশ কয়েকটি সার্ভার প্রতিষ্ঠান। এক সময় এসব জমি ব্যবহার হতো ধানক্ষেত হিসেবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে চীনের নিজেকে মহাশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার কেন্দ্রে চলে এসেছে এ অঞ্চল।

বৃহদায়তনে এআই মডেলগুলো নির্মাণে সহায়তার জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এআই ডাটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ওপেনএআই, ওরাকল ও সফটব্যাঙ্ক, যা এরই মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে ‘স্টারগেট প্রকল্প’ হিসেবে। ওই প্রকল্পের রেফারেন্স টেনে আনহুইয়ের উহুতে সার্ভার ও ডাটা সেন্টারের নির্মাণ প্রকল্পটিকে ‘চীনের স্টারগেট’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

যদিও উহুর সার্ভার ও ডাটা সেন্টারের এ ‘মেগা ক্লাস্টারের’ মধ্যে তুলনা করতে নারাজ অধিকাংশ বিশ্লেষক। এটি মূলত গোটা চীনজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডাটা সেন্টারগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনে চীনের আরো বড় একটি পরিকল্পনার অংশমাত্র, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রমবর্ধমান ভোক্তা-চাহিদা পূরণে এআই পরিষেবার দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

প্রযুক্তি খাতে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশ পিছিয়ে চীন। গবেষণা সংস্থা ইপক এআইয়ের হিসাবে, বর্তমানে বৈশ্বিক কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। আর চীনের নিয়ন্ত্রণে আছে প্রায় ১৫ শতাংশ। দুই দেশের সক্ষমতায় এমন দূরত্ব ঘোঁচানোর উদ্দেশ্য থেকেই এমন পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে বেইজিং।

চলতি বছরের মার্চে বেইজিং এক পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর অধীনে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের দূরবর্তী এলাকাগুলোর বিদ্যমান ডাটা সেন্টারগুলোকে বৃহৎ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে। আর প্রধান প্রধান জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর কাছাকাছি নতুন সার্ভার ফার্ম তৈরি হচ্ছে।

আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের চীনবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা রায়ান ফেদাসিউক এ বিষয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এফটিকে বলেন, ‘চীন সীমিত কম্পিউটিং শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফলাফল ভেবেচিন্তে উদ্যোগ নিচ্ছে। এ বিবেচনার ভিত্তিতেই বেইজিং এখন ডাটা সেন্টার অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।’

উহুর এই ‘ডাটা আইল্যান্ডে’ এরই মধ্যে চারটি নতুন এআই ডাটা সেন্টার পরিচালনা শুরু করেছে হুয়াওয়ে, চায়না টেলিকম, চায়না ইউনিকম ও চায়না মোবাইল। এখানকার ডাটা সেন্টারগুলো থেকে ইয়াংসি অববাহিকার সমৃদ্ধ শহর শাংহাই, হাংঝু, নানজিং ও সুঝোর বাসিন্দাদের সেবা দেয়া হবে। উত্তরাঞ্চলের ইনার মঙ্গোলিয়ার উলানচাব শহরের সেবা পাবে বেইজিং ও তিয়ানজিন। দক্ষিণে গুইঝৌ শহরে স্থাপিত ডাটা সেন্টার থেকে সেবা পাবে গুয়াংঝু। আর গানসু প্রদেশের চিংইয়াংয়ের ডাটা সেন্টার অবকাঠামোর সুবিধা নেবে চেংদু ও চংকিং।

স্থানীয় সরকারের এক বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত উহু শহরজুড়ে ডাটা সেন্টার তৈরি করেছে ১৫টি কোম্পানি। এজন্য কোম্পানিগুলোকে মোট বিনিয়োগ করতে হয়েছে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ইউয়ান (৩৭ বিলিয়ন ডলার)।

উহুর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্লাউড অপারেটরের এক নির্বাহী জানান, এখানকার স্থানীয় সরকার এআই চিপ কেনার মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে, যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়ানির্মিত উন্নত প্রসেসর ও হার্ডওয়্যার সংগ্রহ করতে পারছে না। আবার সীমিত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে স্থানীয় চিপ নির্মাতা হুয়াওয়ে ও ক্যামব্রিকনের পক্ষেও এখন এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া টিএসএমসি ও স্যামসাংয়ের চীনা গ্রাহকদের জন্য উন্নত এআই চিপ তৈরির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে মেটা, গুগল ও এক্স এআইয়ের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো দ্রুত হাজার হাজার এনভিডিয়া চিপ স্থাপন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুধু স্টারগেট প্রকল্পেই ৪ লাখ প্রসেসর ধারণে সক্ষম জটিল অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বৈরি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কম্পিউটিং সক্ষমতার ব্যবধান ঘোঁচানোর উদ্দেশ্য থেকে চীন এমন সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে চীনের এআই ডাটা সেন্টারগুলোকে তুলনামূলক দুর্বল প্রসেসরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অথবা কালোবাজার থেকে সংগৃহীত হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এছাড়াও দূরবর্তী অঞ্চলের অব্যবহৃত ডাটা সেন্টারগুলোয় পড়ে থাকা এআই প্রসেসরকে কাজে লাগানোরও চেষ্টা করছে চীন।

২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের ঢলে গানসু ও ইনার মঙ্গোলিয়ার মতো শক্তিসম্পদে সমৃদ্ধ কিন্তু চাহিদার মূল কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী প্রদেশগুলোয় অনেক ডাটা সেন্টার স্থাপন হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব ও গ্রাহক-চাহিদার ঘাটতির কারণে সেগুলো ব্যবহার হয়নি। ফলে মূল্যবান প্রসেসর অব্যবহৃত পড়ে থেকেছে। যদিও চীনের অন্যত্র এগুলোর চাহিদা তীব্রভাবে বেড়েছে।

(এফটি অবলম্বনে)

আরও