রয়টার্স

নির্বাচনী সমর্থন পেতে ঘন ঘন বিদেশ সফরে মিয়ানমারের ‘বিচ্ছিন্ন’ জেনারেল

পর্যবেক্ষকদের মতে, তার ঘোষিত নির্বাচন মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে না, বরং জান্তার ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

জান্তা নেতার এই সফরগুলোকে মূলত আগামী ডিসেম্বরের বিতর্ক ঘেরা নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জেনারেল তার প্রধান মিত্র চীন ও রাশিয়ায় দু'বার করে এবং থাইল্যান্ড, বেলারুশ ও এই সপ্তাহে কাজাখস্তানে সফর করেছেন।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বর্তমানে ঘন ঘন বিদেশ সফর করছেন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর গত কয়েক বছরে তিনি যতগুলো দেশে সফর করেননি, গত ছয় মাসে তার চেয়েও বেশি দেশে গেছেন এই জেনারেল।

জান্তা নেতার এই সফরগুলোকে মূলত আগামী ডিসেম্বরের বিতর্ক ঘেরা নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জেনারেল তার প্রধান মিত্র চীন ও রাশিয়ায় দু'বার করে এবং থাইল্যান্ড, বেলারুশ ও এই সপ্তাহে কাজাখস্তানে সফর করেছেন।

এই সফরের মাধ্যমে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছেন। মার্চের এক মারাত্মক ভূমিকম্পের পর থেকে এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।

ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, ‘মিন অং হ্লাইংয়ের এ বছরের ঘন ঘন বিদেশ সফর তার বর্ধিত আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন—তার বিরুদ্ধে অভিজাতদের হুমকি কমেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হ্রাস পেয়েছে।‘ তিনি সেনাবাহিনীর কিছু শহর পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন।

জান্তা মুখপাত্র জাও মিন তুন রাষ্ট্রীয় মিডিয়াকে মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক চীন, রাশিয়া ও কাজাখস্তান সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সবগুলো সফরের সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়, তিনটি দেশই মিয়ানমারের নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছে।‘

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের পর গণবিক্ষোভ দমন এবং সহিংসতা বৃদ্ধির জেরে পশ্চিমা দেশগুলো জান্তা সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ান নজিরবিহীনভাবে মিন অং হ্লাইংকে তাদের শীর্ষ সম্মেলন থেকে নিষিদ্ধ করে।

তবুও জান্তা সরকার ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে চলমান সংঘাতের কারণে ভোট হবে দেশের অর্ধেকেরও কম এলাকায়। নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কেবল সামরিকপন্থী দলগুলো, যা সমালোচকদের মতে ‘ক্ষমতায় থাকার নাটকীয় প্রয়াস’ ছাড়া আর কিছু নয়।

সাম্প্রতিক সফরে মিন অং হ্লাইং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘মিয়ানমারে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে চীন সমর্থন করে।‘

বিশ্লেষক ইয়ি মিও হেইনের মতে, ‘চীনের এই সমর্থন জান্তা সরকারকে কূটনৈতিক বৈধতা ও উপকরণগত সহায়তা দেবে, যা তাদের নির্বাচনী নাটককে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।‘

চীন মিয়ানমারে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় তেল-গ্যাস পাইপলাইন ও গভীর সমুদ্রবন্দরসহ নানা অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে, যা মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার।

মিন অং হ্লাইং এখন দেশের ভেতর বাড়তে থাকা প্রতিরোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। চীন-রাশিয়ার সমর্থন হয়তো তাকে স্বস্তি দিচ্ছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, তার ঘোষিত নির্বাচন মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে না, বরং জান্তার ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

গত নভেম্বরে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ৬৯ বছর বয়সী জেনারেলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির চেষ্টা করার ঘোষণা দেন। এতে তার ভ্রমণের বিকল্পগুলিকে সীমিত করে দিয়েছিল। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব দেশব্যাপী সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে জান্তা নেতার অভ্যন্তরীণ চলাচলও কম ছিল।

আরও