গত ৫ জুলাই সিএনএন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছিল। সেখানে ছিল একটি সিনাগগে আগুন লাগানোর চেষ্টা, এক রেস্তোরাঁয় উত্তেজনা, এবং একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ। এই ঘটনাগুলোর অপরাধী কারা, তাদের উদ্দেশ্য কী—তা স্পষ্ট না থাকলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ বা ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এখানেই নিহিত আসল বিপদ। গণমাধ্যমের এই ধরনের প্রতিবেদনে ক্রমশ একটি অভ্যাস তৈরি হচ্ছে—যে কোনো সহিংসতা, অস্থিরতা বা অপরাধকে একরকম স্বতঃসিদ্ধভাবে ‘প্রো-প্যালেস্টাইন' তকমা দিয়ে চিহ্নিত করা। যেন প্যালেস্টাইনের পক্ষে কোনো অবস্থান গ্রহণ মানেই সহিংসতার সমর্থন বা উসকানি।
আরো উদাহরণ আছে। মে মাসে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের বাইরে এক বন্দুকধারীর হামলায় দু’জন নিহত হন। হামলাকারী ‘ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন। তখনও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম হামলাকারীকে ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করে।
জুনে কলোরাডোতে একজন মিশরীয় ব্যক্তি ইসরায়েল সমর্থকদের উপর হামলা চালায়। সেখানেও টেনে আনা হয় ‘প্রো-প্যালেস্টাইন বিক্ষোভের’ ছায়া।
সংক্ষিপ্ত শিরোনাম বা ছোট বাক্যে সংবাদ পরিবেশনের যুক্তি দেখিয়ে যেসব সাংবাদিক এই ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ বিশেষণ ব্যবহার করেন, তারা ভুল বোঝানোর দায় এড়াতে পারেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ সংক্ষিপ্ততাই সাংবাদিকতার চূড়ান্ত নীতি নয়—প্রধান কাজ হলো সঠিকভাবে জনগণকে তথ্য জানানো।
‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ শব্দটির আড়ালে থাকে একটি সুপরিচিত ও বিভ্রান্তিকর বার্তা—যে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান মানেই সহিংসতা। অথচ এই শব্দে প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করা হয়, বাস্তবতা ধামাচাপা পড়ে, আর পাঠকের কাছে পৌঁছে একটি সরলীকৃত ভুল ধারণা।
এর চেয়ে বড় ভুল আর কী হতে পারে? গাজায় কয়েক হাজার শিশু নিহত হয়েছে। অনাহারে মৃত্যু হয়েছে অজস্র শিশু, বয়স্কের। বোমা ফেলার পর বাবা-মাকে তাদের সন্তানের দেহাবশেষ প্লাস্টিক ব্যাগে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এই বিভীষিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা কি নিছক ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’? না, বরং সেটি মানবতার পক্ষে কণ্ঠ তোলা।
কেউ যদি গাজার অবরোধ, অনাহারে মারার নীতি, নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, হাসপাতাল-বিদ্যালয় ধ্বংসের প্রতিবাদ করে—তবে তা কোনো পক্ষের সমর্থন নয়, বরং ন্যূনতম নৈতিক অবস্থান। এটি জীবনের পক্ষে, ন্যায়বোধের পক্ষে।
যারা বলেন ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, তাদের অধিকাংশই আসলে মুক্তি চান—অবরোধ, সামরিক দখলদারি, বংশপরম্পরা নিশ্চিহ্ন করা থেকে মুক্তি। অথচ গণমাধ্যম এই ধরনের চাওয়াকেও সহিংসতার ছায়ায় উপস্থাপন করে। এতে ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ কথাটি যেন এক ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক, বিপজ্জনক তকমা হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এই তকমার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা। শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার খর্ব হয়েছে। সাংবাদিকতার দায়িত্বও এইভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে যারা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অধিকারের কথা বলে, তাদের অবস্থানকে ‘একপাক্ষিক’ বা ‘পক্ষ নেয়া’ বলে দাগিয়ে দেয়া হয়। গাজা কোনো পক্ষ নয়, এটি একটি শিশুর কবরস্থান হয়ে উঠেছে—যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়া হয়, হাসপাতাল ধ্বংস হয়, সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়। অথচ এসবের প্রতিবাদ করলেই ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ বলে তকমা দেয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকতা যদি সত্য, স্পষ্টতা ও প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে হয়, তাহলে এখন সময় এসেছে সাহস করে বলা—এরা মানবাধিকারের পক্ষে। যদি কেউ বলেন ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, তবে তা কী বোঝাতে চায়—তা বোঝানোর দায়িত্বও সাংবাদিকের।
এই ‘প্রো-প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সত্যকে সরলীকরণ করে, জটিল বাস্তবতাকে অস্পষ্ট করে তোলে। মানবতার পক্ষে কণ্ঠস্বরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই শব্দকে এখন অবসরে পাঠানোর সময় এসেছে।
লেখক: ইব্রাহিম আবুশারিফ, কাতার নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক
আল জাজিরা থেকে নেয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত