বিবিসির প্রতিবেদন

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের দ্বারপ্রান্তে ভারত ও ইইউ

এ চুক্তির পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে তিনি। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তার বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও ইইউ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প অংশীদার খুঁজছে।

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও কুচকাওয়াজের বাইরে এ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বিষয়ক আলোচনা।

আগামী ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় দুই দশকের টানাপড়েনের পর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো এ আলোচনাকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করেছেন ভন ডার লিয়েন ও ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।

এ চুক্তির পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে তিনি। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তার বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ও ইইউ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প অংশীদার খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রজাতন্ত্র দিবসের অতিথি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। এ বার্তা হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ নিয়ে অচলাবস্থা চললেও বিশ্বজুড়ে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে দিল্লি। লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের গবেষক চিয়েতিগজ বাজপাই বিবিসিকে বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিতে চায়, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) মর্জির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও বহুমুখী।

চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে গত চার বছরে এটি হবে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এর আগে যুক্তরাজ্য, ওমান, নিউজিল্যান্ডসহ একাধিক দেশের সঙ্গে এফটিএ করেছে দিল্লি। অন্যদিকে ইইউ সম্প্রতি মারকোসুর জোট, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সিনিয়র বিশ্লেষক সুমেধা দাশগুপ্ত বলেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় উভয় পক্ষই নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে। ভারতের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কজনিত ঝুঁকি সামলানোর উপায়, আর ইইউর জন্য চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ। সেইসঙ্গে এর মধ্য দিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সুরক্ষাবাদী নীতি থেকেও ধীরে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিত মিলবে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারতের গুরুত্ব ইইউর কাছে বাড়ছে। দেশটি চলতি বছরই ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি অতিক্রম করে জাপানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেয়া বক্তব্যে ভন ডার লিয়েন বলেন, ইইউ ও ভারত একত্র হলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক জিডিপির এক-চতুর্থাংশ।

ভারতের জন্যও ইইউ সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। এফটিএ হলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও যন্ত্রপাতির মতো খাতে শুল্ক কমে ভারতীয় রফতানিকারকরা লাভবান হবেন।

তবে কিছু বড় মতপার্থক্যও রয়েছে। ইউরোপ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সুরক্ষা, তথ্য নিরাপত্তা ও কঠোর পেটেন্ট নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের জন্য বড় উদ্বেগ ইউরোপের নতুন কার্বন কর—কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত এটি ‘বৃদ্ধিবান্ধব অংশীদারত্ব’ হবে নাকি ‘কৌশলগতভাবে অসম চুক্তি’—তা নির্ভর করবে এ জটিল বিষয়গুলোর সমাধানের ওপর। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো অনিশ্চিত অংশীদারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উভয় পক্ষই লাভবান হবে বলে মত তাদের।

আরও