ইরানের সঙ্গে ফের সামরিক সংঘাত নাকি শান্তিচুক্তি—এ বিষয়ে ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান না হলে ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারেন তিনি। অবশ্য পরে সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রতিনিধিদলের একটি বৈঠক ‘ফলপ্রসূ হয়েছে’ বলে দাবি করেন তিনি। খবর বিবিসি।
ট্রাম্পের ভাষণের সময় ইরানের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আসনসংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত শ্রোতায় পূর্ণ অধিবেশন কক্ষে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে ধ্বংস করা হবে, নাকি দেশটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়ে একটি চুক্তি করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে তারা পুনর্গঠন করতে পারবে এবং আগের যেকোনো সময়ের শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে পারবে? নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব এবং দ্রুতই তা করব—তাদের আবার মানুষ ও দেশগুলোকে হত্যা ও ধ্বংস করার সুযোগ না দিয়েই? আমি কি তাদের নরকে পাঠিয়ে দেব?’
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির জন্য কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরই হতে পারে।
তার এসব মন্তব্য কূটনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দেয়। এর একদিকে ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে আলোচনার পথও খোলা রাখা হচ্ছে।
এদিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প পরে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের তিন ঘণ্টার বৈঠক ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও নিশ্চিত করেছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে তেহরানের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
পরে উইটকফ জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা দিনভর দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করেছেন।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে উইটকফ বলেন, ‘তারা সফলভাবে এক দফা আলোচনা শেষ করেছেন, যা আমরা আশা করি গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক হবে। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন।’
ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়েও আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেন। যদিও দেশ দুটি একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং আমরা এটিও শেষ করব। আমার মনে হয়, মানুষ যতটা বুঝতে পারছে, তার চেয়েও দ্রুত এটি ঘটবে।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আজ নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আতঙ্ক ছড়ানো বা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে ‘বিশ্ববাদী ষড়যন্ত্রের’ কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে এআই-তে নিজেদের নেতৃত্ব ছেড়ে দেবে না।
ট্রাম্পের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বরং ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বলা উচিত। তিনি বলেন, ‘আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম শব্দটি শুনলে এটিকে নকল কিছু মনে হয়। এটি নকল নয়, এটি আসলে অসাধারণ। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
গতকাল সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সই করেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চুক্তিতে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হলেও দ্বীপটির আকাশসীমা ও ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে।
ট্রাম্প এদিন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
অন্যান্য আরব ও ইসলামি দেশের নেতাদের অংশগ্রহণে হওয়া ওই বৈঠকে ‘আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের উপায়’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানান ইউএইর পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
পশ্চিম গোলার্ধের যেকোনো জায়গায় হুমকি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না বলেও সতর্ক করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমরা আমাদের অতুলনীয় সামরিক শক্তি ব্যবহার করব।’
এছাড়া ট্রাম্প কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ করেন। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি ইউএসএ, অ্যান্টিফা এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার নাম উল্লেখ করেন তিনি। এসময় ট্রাম্প কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। ওই সময়ে দেশটির প্রতিনিধিদলকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।