বিশ্লেষণ

কাশ্মীর ও কূটনীতিতে ‘ন্যারেটিভ’ যুদ্ধ: কার গল্প শুনবে বিশ্ব

২০১৯, কিংবা ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়েও দেখা গেছে— যুদ্ধ বন্ধ হলেও বর্ণনার লড়াই চলতে থাকে বহু মাস ধরে। ভারত তার প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বৃত্তে দৃঢ়ভাবে দাবি করে, পাকিস্তান সন্ত্রাসে মদদদাতা রাষ্ট্র। অন্যদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চায়—কাশ্মীরের মানুষ ভারতের নাগরিক অধিকার হরণ ও সামরিক দমন থেকে মুক্তি চায়।

মাত্র ২৬ বছর আগে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা চুপিসারে প্রবেশ করেছিল কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখার ভারতীয় অংশের দুর্গম পার্বত্য উপত্যকায়। এর ফলে শুরু হয় ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্ম জুড়ে চলা কারগিল যুদ্ধ—যা ছিল ভারত-পাকিস্তানের চতুর্থ যুদ্ধ এবং কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয়।

সেই যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা ছিল প্রচণ্ড কঠিন। হাজার মিটার উচ্চতার পাহাড়ি উপত্যকায় যেখানে কেবল পর্বতারোহীদেরই থাকার কথা, সেখানে গোলাবর্ষণে কাঁপছিল আকাশ। সময় বদলেছে। প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক রাজনীতিও রূপান্তরিত হয়েছে। তবে পাল্টায়নি কাশ্মীর ঘিরে তৈরি হওয়া বৈরিতার চরিত্র। শনিবার ঘোষিত যুদ্ধবিরতি হয়তো সাময়িকভাবে গোলাগুলির শব্দ থামিয়েছে, তবে খুব কম মানুষেরই ধারণা এটি স্থায়ী হবে।

কাশ্মীর ইস্যু পাকিস্তানের জন্য শুধু ঐতিহাসিক অবিচার নয়, বরং দেশটির ইসলামিক পরিচয়ের মূলে থাকা আদর্শের ওপর আঘাত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার যুদ্ধবিরতির খবর আসার পর এক্স প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘পাকিস্তান সবসময় আঞ্চলিক শান্তির জন্য কাজ করেছে। তবে তা নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিনিময়ে নয়।‘

অন্যদিকে, ভারতের জন্য কাশ্মীর শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়—এটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির স্বাধীনতা পরবর্তী যুগের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় বিশ্বাসী নেতারাও কাশ্মীর নিয়ে ছিলেন আপসহীন। দেশটির বর্তমান ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অবস্থানও একই রকম।

এই যুদ্ধবিরতি টিকে গেলে পরবর্তী লড়াই হবে প্রচার, বর্ণনা বা বয়ান অর্থাৎ ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে।

ভারত দাবি করেছে, কাশ্মীরে ২৫ জন পর্যটক ও একজন গাইডকে হত্যায় দায়ী উগ্র গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়েবা আসলে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছে। পাকিস্তান তা অস্বীকার করেছে। ভারতের দাবি— বহু দশক ধরে কাশ্মীরে সংঘাত বজায় রাখা, দিল্লির কর্তৃত্ব নস্যাৎ করা ও সংঘাতের আন্তর্জাতিকীকরণ—এই তিনটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কৌশলগত লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যেই কাশ্মীর ভিত্তিক ও বহিরাগত জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছে। এপ্রিলের হামলার আগে পাকিস্তানি গোয়েন্দা মহল কিছুই জানত না—এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পাকিস্তান চেষ্টা করছে কাশ্মীরের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ২০১৯ সালে অঞ্চলটির স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহারসহ অন্যান্য ঘটনার পটভূমি তুলে ধরতে।

এখনকার মতো ১৯৯৯ সালেও দুই দেশের উত্তপ্ত বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছিল যে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হতে পারে পারমাণবিক শক্তিধর দুই রাষ্ট্রের মাঝে। আগেরবার যেমন ভারতীয় সামরিক সাফল্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছিল, এবারও ওয়াশিংটনের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এতে রাশিয়া ও চীন সন্তুষ্ট নয়। তারা এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। তুরস্ক ও সৌদি আরবের ভূমিকা আবার মনে করিয়ে দেয়, ৯০-এর দশকের একমেরু বিশ্বব্যবস্থা আর নেই।

এবার প্রাণহানির হার কম, অর্থনৈতিক ক্ষতিও সীমিত। মূলত যুদ্ধ থামানোর পেছনে মানবিকতার চেয়ে অর্থনৈতিক বিবেচনাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, যুদ্ধ পরের ধাপে চলে গেলে তা দুই দেশকেই বিপর্যস্ত করতে পারত। পরস্পরের সঙ্গে বিরোধ থাকার পরও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি—যেমন পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ চুক্তি দিল্লি স্থগিত করলেও পুরোপুরি বাতিল হয়নি।

১৯৯৯ সালের মতোই এবারও দুই দেশের নেতৃত্ব ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা উপলব্ধি করে পিছু হেটেছে। শনিবার ট্রাম্পের ভাষায় বলা যায়, কমন সেন্স এবং বড় মাপের বুদ্ধিমত্তা দেখিয়েছে তারা। কারণ তারা জানে, সংঘাত বাড়লে তাদের কত কিছু হারাতে হবে।

২০১৯, কিংবা ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়েও দেখা গেছে— যুদ্ধ বন্ধ হলেও বর্ণনার লড়াই চলতে থাকে বহু মাস ধরে। ভারত তার প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বৃত্তে দৃঢ়ভাবে দাবি করে, পাকিস্তান সন্ত্রাসে মদদদাতা রাষ্ট্র। অন্যদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চায়—কাশ্মীরের মানুষ ভারতের নাগরিক অধিকার হরণ ও সামরিক দমন থেকে মুক্তি চায়।

এই বর্ণনার লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কাকে বিশ্বাস করবে বিশ্ব? এই প্রশ্নের জবাব নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ে— কে দ্রুত ও কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে কাজ করতে পারছে, কোন পক্ষ মিডিয়া ও তথ্যযুদ্ধে বেশি দক্ষ এবং বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থান।

আগে ছিল কামান, আজ আছে বয়ান, ভিডিও ফুটেজ, কূটনৈতিক বিবৃতি। আগে ছিল যুদ্ধক্ষেত্র, আজ আছে টুইটার, কূটনৈতিক সম্মেলন আর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ইতিহাসে এই বর্ণনাভিত্তিক যুদ্ধ নতুন কিছু নয়, তবে এখন তা আরো প্রভাবশালী ও জরুরি। কারণ পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই দেশের সংঘর্ষ এখন কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়—এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, পলিটিকো

আরও