ট্রাম্পের শর্ত

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিলেই সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হবে

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি হলে তা রিয়াদের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সৌদি আরব ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ যোগ দিলেই পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হবে। বেসামরিক এ চুক্তি ঘোষণার একদিন পর গতকাল ট্রাম্পের এ বক্তব্য আগে থেকেই অস্পষ্ট এই চুক্তিকে ঘিরে নতুন বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। কারণ, চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। খবর আল জাজিরা।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, চুক্তিটি অনুমোদন পাবে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়ার ওপর।

এ বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি হলে তা রিয়াদের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হবে।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প এ পোস্ট দেয়ার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন— এমনটা মনে হয় না। তবে আগের বিভিন্ন আলোচনায় প্রেসিডেন্ট বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন।

তিনি আরো বলেন, ‘রিয়াদ যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ না দেয়, তাহলে এ চুক্তি হবে না।’

গত বুধবার মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, ওয়াশিংটন ও রিয়াদ কয়েক দশকব্যাপী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতার জন্য একটি চুক্তি এবং সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ‘দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে।

চুক্তিটি কার্যকর হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

মার্কিন কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরব বিদেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি আমদানি না করে নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার (এনরিচমেন্ট) সুযোগ পাবে।

এমন ব্যবস্থা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক নীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, যেসব দেশের আগে থেকেই এ সক্ষমতা নেই, তাদের কাছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি ও জ্ঞান হস্তান্তরের বিরোধিতা করে এসেছে ওয়াশিংটন।

তবে গতকালের পোস্টে ট্রাম্প ওই খবর অস্বীকার করে লিখেছেন, ‘কোনো ধরনের উপাদান সমৃদ্ধকরণ (এনরিচমেন্ট) হবে না!’

তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক (নন-এনরিচড) পারমাণবিক স্থাপনার বিরোধী নয়।’

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য। এই চুক্তির অধীনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ নয়। বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এটি প্রয়োজন হলেও অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তারা নিজেদের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে দেখে।

অন্যদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চাচ্ছে সৌদি আরব।

তবে বুধবার ঘোষিত চুক্তির সমালোচনা করেছে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতাও সতর্ক করেছেন, যদি সৌদি আরবকে নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।

কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এতে ইরানও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে উৎসাহিত হতে পারে। অন্যদিকে, অনেক বছর ধরে ধারণা করা হয় যে ইসরায়েলের কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতার’ নীতি অনুসরণ করে আসছে।

বর্তমানে তুরস্ক, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বিভিন্ন মাত্রায় বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামো পরিচালনা করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ইউএই ও বাহরাইন প্রথম ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এরপর মরক্কো ও সুদানও এই চুক্তিতে যোগ দেয়, যদিও সুদান এখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি।

এর আগে ১৯৯৪ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল জর্ডান।

তবে গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের পর চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, শুরু থেকেই আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে নেয়া হয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনই দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে উৎসাহিত করে আসছে।

আরও