গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন আর আশংকা নয়— বাস্তবতা। অঞ্চলটিতে গত পাঁচ সপ্তাহে ক্ষুধায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮২ জন। শিশুদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি আরো ভয়াবহ—এক বছরে অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জনের। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর মতে, ইসরায়েল যে পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে, তা এই মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ রোধে পর্যাপ্ত নয়।
গাজায় দুইবার স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবে কাজ করা ড. জেমস স্মিথ বলেন, এটা এক ধরনের বর্বর হত্যাকৌশল। তার ভাষায়, ক্ষুধা মানুষের দেহকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে। প্রথমে শরীর নিজেই নিজের পেশি ও চর্বি খেতে শুরু করে। এরপর বিপাকক্রিয়া ধীর হয়, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়, কিডনি বিকল হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত যখন শরীর আর নিজেকে বাঁচাতে পারে না, তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
গাজায় চিকিৎসাসেবা দেয়া ড. ঘাসান আবু-সিত্তাহ বলেন, ক্ষুধায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও অভিভাবকহীনরা। গাজায় এখন হাজার হাজার এতিম শিশু রয়েছে যাদের খাওয়ানোর মতো কেউ নেই। তারা খাদ্যের অভাবে নীরবেই মারা যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেই গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রতি ছয়টি শিশুর একজন ছিল চরম অপুষ্টিতে আক্রান্ত। এখন সেই অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
গাজার মানুষের ওপর ইসরায়েলের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নতুন নয়। ২০০৭ সালে হামাস গাজা নিয়ন্ত্রণে নিলে প্রথম অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল। পরে এক আইনি লড়াইয়ে প্রকাশ পাওয়া নথিতে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল ‘সর্বনিম্ন জীবিকা’ ধরে রেখে খাদ্য সরবরাহ করত, যাতে মানুষ কেবল টিকে থাকতে পারে, তার বেশি নয়।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির প্রভাব প্রজন্ম ধরে বহন করতে হয়। ড. স্মিথ বলেন, অপুষ্ট মায়েরা স্বল্প ওজনের শিশু জন্ম দেন, আর সেই দুর্বলতা পরবর্তী প্রজন্মেও থেকে যায়।
জাতিসংঘ-সমর্থিত আইপিসি গত সপ্তাহেই জানিয়েছে, গাজায় সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন, এখন আর বিষয়টি আশংকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, দুর্ভিক্ষ এরই মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
ড. জোনস আরো বলেন, একটি অঞ্চলকে ‘দুর্ভিক্ষপীড়িত’ ঘোষণার জন্য তিনটি মানদণ্ড প্রয়োজন। চরম খাদ্য ঘাটতি, অপুষ্টির উচ্চ হার আর খাদ্যজনিত মৃত্যুর সংখ্যা। গাজায় প্রথম দুটি এরই মধ্যে পূরণ হয়েছে। কিন্তু তৃতীয়টি যাচাই করা কঠিন, কারণ অনেকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছেন। তাদের মৃত্যু রেকর্ডই হচ্ছে না। কেউ অপুষ্টিতে মারা গেলেও মৃত্যুর কারণ হিসেবে বোমা বা গুলিতে নিহত লেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি শুধুই দুর্ভিক্ষ নয়, এটা মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিকৃত ও নির্মম কষ্টের দৃশ্য। বিশ্ব চেয়ে দেখছে, কিন্তু কিছু করছে না।