আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক। আগামী ১৫ আগস্ট আলাস্কায় বৈঠকে বসতে পারেন দুই নেতা। কিন্তু এই মুহূর্তে কেন তারা বৈঠক করতে চাইছেন?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান নিজের ব্যক্তিত্বের প্রভাব কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ শেষের একটি চুক্তি আনতে। তার বিশ্বাস, মস্কোর ছয় মাসের অনমনীয়তা সামনাসামনি বৈঠকের মাধ্যমে ভাঙা সম্ভব। তিনি এখনো মনে করেন, ক্রেমলিনকে যুদ্ধ থামাতে রাজি করানো যাবে। যদিও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি দাবি করেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের জনগণ এক, আর যেখানে রুশ সেনা পা ফেলবে সেটাই রাশিয়া।
অন্যদিকে পুতিনের লক্ষ্য সময় কেনা। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইউক্রেনের মে মাসে দেয়া নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করেছেন তিনি। এর বদলে দিয়েছেন দুইবারের একতরফা, স্বল্প ও গুরুত্বহীন যুদ্ধবিরতি। এদিকে গ্রীষ্মকালীন অভিযানে রুশ বাহিনী ফ্রন্টলাইনে অগ্রসর হচ্ছে। যা আলোচনায় তাকে আরো সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
বৈঠক হলে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন করতে—যার উদ্দেশ্য যুদ্ধের অবসান। তবে রাশিয়া গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে এই ফরম্যাট প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর পুতিনের উদ্দেশ্য হতে পারে ট্রাম্পকে মস্কোর বয়ানের কক্ষপথে টেনে আনা।
তবুও, বৈঠক এবার সত্যিই হতে পারে। আর সেটি যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে নানা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধে পাঁচটি পথ সামনে আসতে পারে—
নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি: সম্ভাবনা ক্ষীণ
পুতিন যে বর্তমান ফ্রন্টলাইন রেখে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবেন, তা প্রায় অসম্ভব। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইউক্রেন এমন প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করে। সে সময় ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে এসে ইস্তাম্বুলে নিম্নস্তরের আলোচনায় যান। যদিও ইতিবাচক ফল মেলেনি। এ বছরের শুরুতে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিও বিশেষ সফল হয়নি। বর্তমানে ক্রেমলিন ফ্রন্টলাইনের ছোট ছোট সাফল্যকে বড় কৌশলগত সুবিধায় রূপ দিচ্ছে। অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত পুতিন থামতে চাইবেন না, কারণ এখন তিনি জয়ের পথে আছেন।
বাস্তববাদী সমঝোতা ও শীতে নতুন আলোচনা
সম্ভাবনা আছে যে, আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত হতে পারে আগামী শীতে আবারো আলোচনায় বসার। তখন যুদ্ধক্ষেত্র ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাবে। তত দিনে পুতিন পূর্বাঞ্চলের পোক্রোভস্ক, কস্তিয়ানতিনিভকা ও কুপিয়ানস্ক দখল করতে পারেন, যা তাকে শক্ত অবস্থান দেবে। এরপর ২০২৬ সালে যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে। নইলে কূটনৈতিকভাবে স্থায়ী দখলের পথে হাঁটবেন পুতিন। এ সময় পুতিন যুদ্ধের কারণে স্থগিত থাকা ইউক্রেনের নির্বাচন ইস্যুও তুলতে পারেন। জেলেনস্কির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে রাশিয়াপন্থী প্রার্থী বসানোর চেষ্টা হতে পারে।
ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকে, ইউক্রেন হয়তো ফ্রন্টলাইনে বড় ছাড় না দিয়ে টিকে থাকতে পারবে। রুশ বাহিনী যদি আবারো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়, পুতিন আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারেন।
এরইমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি ‘রিএশিউরেন্স ফোর্স’ পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। যা কিয়েভসহ বড় শহরে অবস্থান করে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে, পুনর্গঠনে সহায়তা করবে এবং মস্কোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাপ দেবে। ইউক্রেনের জন্য এটিই সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা।
ইউক্রেন ও ন্যাটোর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর পুতিন যদি পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল দেখেন আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রুশ সম্পর্ক উন্নত হয়, তবে ইউক্রেন একা হয়ে পড়বে। মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইউরোপ যুদ্ধের ভারসাম্য বদলাতে ব্যর্থ হতে পারে। পূর্বাঞ্চলের সাফল্য ধীরে ধীরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পতনে রূপ নিতে পারে। এতে রাজধানী কিয়েভ পর্যন্ত হুমকিতে পড়বে। জনবল সংকট ও জেলেনস্কির বৃহত্তর সেনা মোতায়েনের দাবি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াবে। ন্যাটো ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দিতে ব্যর্থ হলে ইউক্রেনের স্বাধীনতার ইতি ঘটতে পারে।
পুতিনের জন্য আফগানিস্তানের মতো বিপর্যয়
আলোচনা পরেও রাশিয়া হয়তো যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। এতে ক্রমাগত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে, ভারতের বাজার হারাতে পারে, রিজার্ভ তহবিল শেষ হয়ে আসতে পারে। বারবার কূটনৈতিক সমাধান প্রত্যাখ্যান করায় মস্কোর অভিজাত মহলে অসন্তোষ বাড়তে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদল হলে পশ্চিমা নীতি আবার রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে পারে।
সোভিয়েতরা আফগানিস্তানে আটকে গিয়ে যেভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল একইভাবে পুতিনও হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। পশ্চিমা কৌশলবিদদের জন্য এটাই হয়তো শেষ আশার জায়গা, যারা ন্যাটোর পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ বা ইউক্রেনের একক সামরিক বিজয়ের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না।