জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কনট প্লেস পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, রাস্তায় ব্যারিকেড এবং পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা, দিল্লিজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যেও গতকাল বিক্ষোভে মানুষের অংশগ্রহণ কমেনি। পুলিশি বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসার পর আন্দোলন আরো বিস্তৃত হয়েছে। এদিকে আজ সমগ্র ভারতজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের ডাকা বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে দেশটির বিরোধী দলগুলো।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গতকাল যন্তর মন্তরে বিক্ষোভরত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে না সরালে পরবর্তী দাবি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ।’ সরকারের সমালোচনা করে দীপকে বলেন, ‘বিক্ষোভ দমন করতে ব্যারিকেড দেয়া এবং মোবাইল জ্যামার বসাতে যে পরিমাণ শ্রম দেয়া হয়েছে, তার অর্ধেকও যদি প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে দেয়া হতো, তবে ২২ জন শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচানো যেত।’
তিনি আরো বলেন, ‘মোদিজি, আমি আবারো আপনাকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। তা না হলে বিষয়টি শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিষয়টি আপনার পদত্যাগের দিকেও গড়াবে।’ তার মতে, একজন অযোগ্য ও ব্যর্থ মন্ত্রী পদে বহাল থাকতে পারেন না এবং কোটি কোটি ভারতীয় শিক্ষার্থীর জীবনের চেয়ে একজন মন্ত্রীর পদ কখনই বড় হতে পারে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি নজরে আনতে ও একটি টুইট করতে প্রধানমন্ত্রীর ৩৪ দিন সময় লেগেছে; এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে সরকার এখনো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিজেপি সরকার জানিয়েছে, তারা সিজেপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নড্ডার মতে, এ আলোচনা কোনো সরকারি কার্যালয়ে হতে হবে। বিপরীতে সিজেপি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আলোচনা কেবল আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরে অথবা কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ার মতো কোনো নিরপেক্ষ জায়গায়ই হতে পারে।
এর মধ্যে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা আজ দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘দিল্লির বাইরেও আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি শহর ও গ্রামে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে হবে। চলুন এ বিক্ষোভকে জাতীয় স্তরে নিয়ে যাই। অনুগ্রহ করে শুক্রবার সারা দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করুন।’
গতকাল দিল্লির যন্তর মন্তরের পাশাপাশি মুম্বাই, পাটনা, বেঙ্গালুরু, রাঁচি, ভোপাল, চণ্ডীগড় ও কান্নুরসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কর্মসূচি পালন করেছে। দিল্লিতে দিনের বেশির ভাগ সময় যন্তর মন্তরের মূল অবস্থান তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সন্ধ্যায় সংসদ মার্গ ও আশপাশে উত্তেজনা, বোতল ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে রাঁচিতে কংগ্রেস ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং বিহারের বেগুসরাইয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর লাঠিচার্জ ও আটকের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের ৩৪তম দিনে এসে প্রায় সব বিরোধী দল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোয় এটি এখন শুধু পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসবিরোধী আন্দোলন নয়, মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গতকাল বিকাল ৪টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যন্তর মন্তরের দেড় কিলোমিটার এলাকার মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়। জিও, ভারতী এয়ারটেলসহ মোবাইল অপারেটরগুলো এ নির্দেশ কার্যকর করেছে। এতে যন্তর মন্তর, সংসদ মার্গ, বারাখাম্বা রোড ও কনট প্লেসের বিস্তীর্ণ এলাকায় মোবাইল ডেটা বন্ধ হয়ে যায়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিক্ষোভকারীরা সরাসরি সম্প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিতে বাধার মুখে পড়েন। পাশাপাশি দোকান, রেস্তোরাঁ ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনও ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আন্দোলনের তথ্য ও পুলিশি অভিযানের ছবি বাইরে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেই সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছে। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সহিংসতা ও গুজব ছড়ানো প্রতিরোধ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দিল্লির অন্তত ১৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রয়েছে, এতে রাজধানী শহরটির যাতায়াত ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কনট প্লেস ও আশপাশে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়।
গতকাল যন্তর মন্তরের মূল অবস্থানে হাজারো শিক্ষার্থী বৃষ্টি উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করেন। তবে সন্ধ্যার দিকে সংসদ মার্গে পুলিশের দিকে পানির বোতল ও পাথর নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। দিল্লি পুলিশের সহকারী কমিশনার বিবেক ভগতসহ কয়েকজন কর্মকর্তা আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মুখোশধারী একদল ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ককরোচ জনতা পার্টি বলেছে, আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী কিছু ‘উচ্ছৃঙ্খল উপাদান’ ঢুকে পড়েছে। তাদের ঠেকাতে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
দিল্লির বাইরে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রাঁচিতে বিজেপির রাজ্য কার্যালয় ঘেরাও করতে গেলে কংগ্রেস ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে পাথর, ডিম, টমেটো ও পানির বোতল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা দুই পক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিহারের বেগুসরাইয়ে কালেক্টরেটের সামনে বিক্ষোভে পাথর নিক্ষেপ শুরু হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কয়েকজনকে আটক করে। কেরালার কান্নুরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের মিছিলে জলকামান ব্যবহার করা হয়। পাটনায় আগের দিনের বিক্ষোভের ঘটনায় ৮৫ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় এক হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা এবং অন্তত ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুম্বাইয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভের অভিযোগে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীকে আটক করা হলেও পরে অনেককে ছেড়ে দেয়া হয়।
আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও ক্রমে বড় বিতর্ক হয়ে উঠেছে। তবে গতকাল নতুন করে গুলি চালানোর নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো মূলত ২০ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টির মিছিল ঘিরে সংঘর্ষের। আহত একাধিক বিক্ষোভকারী দাবি করেছেন, পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স তাদের ওপর পেলেট গান ব্যবহার করেছে। সফদরজং হাসপাতালের একটি মেডিকো-লিগ্যাল নথিতে একজন আহত ব্যক্তির শরীরে পেলেটের আঘাতের উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। ১৯ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা এবং আরেকজনের গলার গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালির কাছে পেলেট আটকে থাকার কথাও বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ স্বীকার করেনি। দিল্লি হাইকোর্ট ২০ জুলাইয়ের সংঘর্ষের সব ভিডিও ও ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারত সরকার আন্দোলন প্রশমনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্তকারীদের ছাড় দেয়া হবে না। তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের ঘোষণা আন্দোলন থামানোর কৌশল বলে দাবি করেছে সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে না।
বিরোধী দলগুলোর অবস্থানও গতকাল আরো কঠোর হয়েছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোটের সংসদ সদস্যরা জাতীয় পতাকা নিয়ে গান্ধী স্মৃতির দিকে যাত্রা করেন। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের বাস থামিয়ে দিলে কংগ্রেস কর্মীদের কয়েকজন ব্যারিকেডে উঠে বিক্ষোভ করেন। পরে গান্ধী স্মৃতিতে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাহুল অভিযোগ করেন, মোদি সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করে গণতন্ত্রকে হত্যা করছে। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা দাবি করেন। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি, আজাদ সমাজ পার্টির চন্দ্রশেখর আজাদ এবং কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াংকা গান্ধীও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।