কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া হামলা-পাল্টাহামলা দুই দেশকে আবার সর্বাত্মক যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েকদিনে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ পুনর্বহাল করেছে, ওমান উপসাগরে জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে এবং অবরোধ ভাঙার অভিযোগে ট্যাংকার অচল করেছে। ইরানও হরমুজে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান ও ওমান পর্যন্ত। সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধনাগার, বন্দর, সেতু, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত-পাল্টা আঘাত হানা হচ্ছে। নতুন করে সংঘাত শুরুর পর মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। আবার জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন একজন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত মার্চের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ প্রথম কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, জর্ডানে ১৭ জুলাই ইরান ও তার মিত্র বাহিনীর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। এ ঘটনায় আরো একজন সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। হামলায় আহত অন্য চার মার্কিন সেনাকে জর্ডানের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সামান্য আঘাত পাওয়া অন্য কয়েকজন সেনাকে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসা।
অন্যদিকে হুথিরা বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের জ্বালানি পথ বন্ধের হুমকি দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও লোহিত সাগরের পরিবহন রুট একসঙ্গে বিপর্যস্ত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজার দ্বিমুখী অবরোধের মুখে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তখন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে সরাসরি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিনের রেড লাইনগুলো ভেঙে পড়ায় প্রতিটি নতুন হামলা-পাল্টাহামলায় মধ্যপ্রাচ্যকে বিস্তৃত ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার শুরুর জায়গায় ফিরে গেছে। এখন দুই পক্ষকে হয় পিছু হটতে হবে, নয়তো সংঘাত আরো বাড়ানোর পথ বেছে নিতে হবে। হামলার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলও বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, এমনকি ওমানের মতো ওয়াশিংটনের সহযোগী দেশকে সংঘাতে টেনে আনার ঝুঁকি বিবেচনায় অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধটি পাঁচ কিংবা ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ইরানে বোমাবর্ষণ করতে দেখা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আমি বুঝতে পারছি না, ট্রাম্প কীভাবে সামরিকভাবে ইরানের শাসন ব্যবস্থাকে পরাজিত করবেন।’
চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আঘাত করছে, ইরানও পাল্টা আঘাত করছে। এ পরিস্থিতি দেখে আমার ধারণা, সংঘাতটি কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। এমনকি এটি আরো বিস্তৃত হতে পারে। এর সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।’
যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধবিরতি সমঝোতায় প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেয়ার কথা থাকলেও উল্লেখ করা হয়েছিল এটি মূলত ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বলছে, হরমুজ আন্তর্জাতিক জলপথ; যুদ্ধের আগের মতোই এটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং টোলমুক্ত থাকতে হবে। এ দ্বৈত ব্যাখ্যাই সাময়িক যুদ্ধবিরতির ভিত দুর্বল করে দেয়।
গত ২৫ জুন হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরান ড্রোন হামলা চালায়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পরদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং উপকূলীয় রাডার লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তার পরদিন বিকল্প পথ ব্যবহারকারী একটি ট্যাংকারে হামলা করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র আবারো পাল্টা আঘাত হানে। এ হামলা-পাল্টাহামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে কুয়েত ও বাহরাইন। দুটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির স্বাগতিক।
সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়ায় ওয়াশিংটন। বহু বছর পর ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারে তেল বিক্রির যে ছাড় দেয়া হয়েছিল, সেটি বাতিল করা হয়। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও তেল নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালকে চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয় এবং হরমুজ নিয়ন্ত্রণকে ‘অলঙ্ঘনীয় রেড লাইন’ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে পাল্টাহামলার ভৌগোলিক পরিধি আরো বাড়ায় ইরান। কুয়েত ও বাহরাইনের পাশাপাশি হামলার শিকার হয় মধ্যস্থতাকারী কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান ও ওমান।
গত সাতদিনে সংঘাত ধারাবাহিকভাবে তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ পুনর্বহাল করেছে, যা অন্তর্বর্তী সমঝোতার অংশ হিসেবে তুলে নেয়া হয়েছিল। মার্কিন বাহিনী ওমান উপসাগরে জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে, অবরোধ ভাঙার অভিযোগে বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ বদলে দিয়েছে এবং একটি খালি ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করেছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান বলেছে, তার অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ফলে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে।
এবারের সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন হলো বেসামরিক অবকাঠামোকে হামলার আওতায় আনা। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র হরমুজসংলগ্ন এলাকা ছাড়িয়ে উত্তর ও দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বাড়িয়েছে। ইরানের দক্ষিণে সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিমানবন্দর, বন্দরসংলগ্ন স্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো আক্রান্ত হয়েছে। বন্দর আব্বাসে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও টানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জাস্ক এলাকায় পানি শোধন ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় ২০ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবঞ্চিত হয়েছে। চাবাহার বন্দরে একটি নজরদারি টাওয়ার ধ্বংস করা হয়েছে, যেটি বিপ্লবী গার্ড জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করত বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। তেহরানের দাবি, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার সীমা অতিক্রম করেছে দাবি করে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কুয়েতে টানা দুইদিনে পানি শোধনাগারে হামলা হয়েছে। দেশটি পানীয়জলের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শোধনের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া দেশটির বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত হয়েছে এবং কুয়েত এয়ারওয়েজকে অধিকাংশ ফ্লাইটের সময়সূচি বদলাতে হয়েছে।
বাহরাইনেও একাধিকবার সাইরেন বেজেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, তারা শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং বাহরাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের আল আজরাকে মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছে তেহরান। কাতারে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে একটি শিশু আহত হয়েছে। ওমানও ইরানের পাল্টাহামলার আওতায় এসেছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সৌদি আরবে হামলা। প্রায় চার মাস পর প্রথমবারের মতো সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করেছে ইরান। রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে আল-খারজের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, যেখানে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে, হামলার লক্ষ্য ছিল বলে জানা গেছে।
একই সঙ্গে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবুতেও সতর্কসংকেত জারি করা হয়। ইয়ানবুতে সৌদি আরবের তেল শোধনাগার ও অপরিশোধিত তেল রফতানি টার্মিনাল রয়েছে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে অধিকাংশ তেল লোহিত সাগর দিয়ে রফতানি শুরু করেছে। ফলে ইয়ানবু লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে শুধু সৌদি আরব নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের বিকল্প সরবরাহ পথও ঝুঁকিতে পড়বে।
ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছে। যেসব দেশ মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি দিয়েছে বা তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিচ্ছে, তাদের ‘সমপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া’র জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বিপ্লবী গার্ডের বক্তব্যে সামরিক স্থাপনার কাছ থেকে নাগরিকদের দূরে থাকার নির্দেশও রয়েছে।
এছাড়া ইরান তার ইয়েমেনি মিত্র হুথিদের লোহিত সাগরের তেল পরিবহন পথ বন্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আরো হামলা চালালে হুথিরা বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে হুথিরা সৌদি আরবকে সতর্ক করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সৌদি তেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্য হবে। হরমুজ ও লোহিত সাগর একই সঙ্গে বিপর্যস্ত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজার কার্যত দ্বিমুখী অবরোধের মুখে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তখন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে সরাসরি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। নতুন করে সংঘাতের পর তেলের দাম এরই মধ্যে এক মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।