আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে নতুন মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ভোট

মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় ছোট এবং উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বড় দেখায়। ফলে মানচিত্রে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় একই আয়তনের মনে হয়, যেখানে বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়।

বিশ্বমানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন যথাযথভাবে তুলে ধরতে প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশনের পরিবর্তে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে জাতিসংঘ। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় শুধু যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিনিধি এ প্রস্তাবকে 'অপ্রয়োজনীয়' বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

নতুন মানচিত্রটি ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে জাতিসংঘের এ প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে সদস্য দেশ বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরনো মারকেটর প্রজেকশন ব্যবহার থেকে বিরত রাখা কিংবা নতুন মানচিত্র ব্যবহারে বাধ্য করার সুযোগ নেই। তবে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনে মারকেটর মানচিত্রের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এ সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন দেশের পাঠ্যক্রম ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে এ প্রস্তাব গ্রহণের প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয়া টোগো বলেছে, প্রস্তাবটি স্বীকার ও নিশ্চিত করে যে, অসমানুপাতিক মানচিত্রগত উপস্থাপন—বিশেষ করে মারকেটর প্রজেকশনের কারণে তৈরি উপস্থাপন—মানুষের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভূরাজনীতি ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে বিশ্ববাসীর সম্মিলিত ধারণায় আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন ব্যাপকভাবে ছোট করে দেখানো হয়েছে।

প্রস্তাবটি পাস হওয়ার আগে বক্তব্যে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আলোচনা। এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাই আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ষোলশ শতাব্দীতে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর সমুদ্রপথে নাবিকদের দিকনির্দেশনার সুবিধার্থে তার মানচিত্র প্রজেকশন তৈরি করেন। ১৫৬৯ সালে চালু হওয়া এ প্রজেকশন প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রচলিত মানচিত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তবে মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় ছোট এবং উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বড় দেখায়। ফলে মানচিত্রে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় একই আয়তনের মনে হয়, যেখানে বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়।

আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন নিয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত #CorrectTheMap প্রচারণায় বলা হয়েছে, আফ্রিকার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো ও ইউরোপের বড় একটি অংশকে জায়গা দেয়া সম্ভব; এরপরও কিছু এলাকা অবশিষ্ট থাকবে। Change.org-এ প্রচারণাটির আবেদনে ১১ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে আফ্রিকান ইউনিয়নও প্রচারণাটিকে সমর্থন করে। পরে উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে টোগোকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

টোগোর এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্সও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো জানান, ফ্রান্স মারকেটর প্রজেকশন বাদ দিয়ে ব্যবহার-উপযোগী এবং প্রকৃত ভূপৃষ্ঠের আয়তনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মানচিত্র ব্যবহার করবে। দেশটি এখন একার্ট ফোর প্রজেকশন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যা ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের কাছাকাছি।

মারকেটর প্রজেকশনের সমালোচনা অবশ্য নতুন নয়। ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এ মানচিত্রে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে। অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ এ প্রবণতাকে ‘কার্টোগ্রাফিক ঔপনিবেশিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সমালোচকদের মতে, মানচিত্রে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে তুলনামূলক বড় এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে ছোট করে দেখানোর ফলে দক্ষিণের দেশগুলোর গুরুত্বও দৃশ্যত কমে যায়। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোগত পক্ষপাতকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স ছিলেন মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সমালোচক। ১৯৭৩ সালে তিনি গল-পিটার্স প্রজেকশনের ভিত্তিতে ‘পিটার্স বিশ্বমানচিত্র’ প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে এটি মারকেটর মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

#CorrectTheMap প্রচারণায় অবশ্য ২০১৮ সালের ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক একদল মানচিত্রবিদের তৈরি এ নকশায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তন তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে তুলে ধরা হয়। প্রচারণাটির সমর্থকদের দাবি, এর মাধ্যমে আফ্রিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের লন্ডনভিত্তিক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জে জে এনোক বলেন, মারকেটর প্রজেকশন আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে দৃশ্যত ছোট করে দেখিয়েছে। নতুন সমান-আয়তনের মানচিত্র শিক্ষা ও জনসাধারণের বোঝাপড়ার জন্য আরো নির্ভুল ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে আফ্রিকার জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে পুরনো ও বিকৃত মানচিত্রগত ধারণার বাইরে থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হবে।

জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে টোগোর রাজধানী লোমেতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ইউনেস্কো, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং গুগল ম্যাপসের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে টোগো সরকার।

ভোটের আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে বলেন, যারা প্রশ্ন করেন এখন কেন—তাদের বলি, এখন কেন নয়? আমরা যখন বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন বর্ণনাটি পরিবর্তনের সময় এসেছে। তিনি আরো বলেন, আফ্রিকায় আমাদের নিজেদের যা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে, তা পরিবর্তনের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।

আরও