সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে। দারফুর অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) যে ভয়াবহ নৃশংসতা চালাচ্ছে, তার চিত্র উঠে এসেছে সদ্য দখল হওয়া আল ফাশির নগরী থেকে পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। সম্প্রতি রয়টার্সকে তারা বলেছেন, আরএসএফ বেসামরিক নাগরিকদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তাদেরকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি করেছে, ড্রোন হামলা চালিয়েছে এমনকি মানুষকে ট্রাক দিয়ে পিষেও হত্যা করা হয়েছে।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে গত ২৬ অক্টোবর সুদানের অন্যতম বৃহৎ নগরী আল-ফাশির দখলে নেয়ার মধ্য দিয়ে দারফুর অঞ্চলে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণ আরো সুদৃঢ় হয়। দখলের পর শহরের উপকণ্ঠে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার দৃশ্য এবং পালাতে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ভিডিও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের জন্ম দেয়। কিন্তু সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বহু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ আরএসএফের আক্রমণ শুরুর পর থেকেই আল-ফাশির সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে শহরটি থেকে পালিয়ে আল-দাব্বা ও তাউইলায় আশ্রয় নেয়া চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে দখলদারির প্রথম দিকের দিনগুলোর ভয়াবহ চিত্র।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী তাউইলা থেকে রয়টার্সকে জানান, তারা যখন তীব্র গোলাবর্ষণের মধ্যে শহর ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন আরএসএফের ট্রাক তাদের ঘিরে ফেলে। এরপর মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষকে হত্যা করা হয় এবং পরে ট্রাক দিয়ে পিষে দেয়া হয়। ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তরুণ, বয়স্ক, শিশু—সবাইকে তারা পিষে দিয়েছে। আরএসএফ যোদ্ধারা কিছু বেসামরিক মানুষকে অপহরণ করেও নিয়ে গেছে।’
মুবারক নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আরএসএফের আক্রমণের দ্বিতীয় দিনেও হত্যাযজ্ঞ চলছিল। সেনাবাহিনীর ঘাঁটি দখলের পরদিন তারা আবাসিক এলাকায় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায়। তিনি বলেন, ‘একটি রাস্তায় ৫০ বা ৬০ জন মানুষকে তারা নিমিষেই হত্যা করে। তারপর একটু দূরের আরেকটি রাস্তা থেকে আবার মেশিনগানের গুলির শব্দ। আমি সামনে দাঁড়িয়ে এ গণহত্যা দেখেছি।’
মুবারক বলেন, ‘যে-ই রাস্তায় বের হয়েছে, তাকেই লক্ষ্য করে ড্রোন থেকে হামলা ও অসংখ্য বুলেট ছোড়া হয়েছে। যারা আহত বা বয়স্ক এবং যারা শহর ছাড়তে পারেননি, তাদের নিজ বাড়িতেই হত্যা করা হয়।’
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘স্যাটেলাইট চিত্রে আল-ফাশিরের বিভিন্ন জায়গায় মরদেহের মতো বস্তু দেখা গেছে। কিছু চিত্রে মাটির স্তরের পরিবর্তনও লক্ষ করা গেছে, যা মূলত গণকবরের ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি অনেক স্থাপনা উধাও হওয়া, বড় বড় গাড়ির উপস্থিতি ইত্যাদি দেখে বোঝা যায়, এসব দিয়ে মরদেহ বা জীবিত মানুষ কিংবা লুটপাট করা জিনিসপত্র স্থানান্তর করা হতে পারে।’
আল-ফাশিরের গণহত্যার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আবদাল্লাহ জানান, গণহত্যার মধ্যে তিনি আল-দাব্বায় পালিয়ে এসেছেন। আবদাল্লাহ বলেন, ‘শহর থেকে পালানো বেসামরিক নাগরিকদের ওপরও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এক জায়গায় আমি স্তূপ করে রাখা প্রায় ৪০টি মরদেহ দেখেছি।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভীত-সন্ত্রস্ত লোকজন এখনো আল-ফাশিরে আটকা পড়ে আছে। আমার আশঙ্কা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, জাতিগত সহিংসতা—সুদানে সবগুলোই চলমান।’
আল-ফাশির থেকে পালাতে সক্ষম হওয়া লোকজন জানিয়েছেন, আরএসএফের সহিংস তল্লাশি, পুরুষদের নিখোঁজ হওয়া এবং মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে অপহরণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তারা পেরিয়ে এসেছেন।
উম্ম জুমা নামে এক নারী চার নাতি-নাতনি নিয়ে আল-দাব্বায় পৌঁছেছেন। পালানোর আগে তিনি দেখেছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা বেসামরিক নাগরিকদের পিটিয়ে হত্যা করছে। তিনি বলেন, ‘হামলার পরও যারা মারা যায়নি, তাদের দেখিয়ে আরএসএফের যোদ্ধারা বলত—এটা মরেনি, ওকেও শেষ করে দাও।’
এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে আরএসএফের এক নেতা রয়টার্সকে জানান, এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, ‘তবে আল-ফাশিরে যা ঘটেছে, সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্ররা তা বাড়িয়ে বলছে।’