আল জাজিরা

ইরানে ট্রাম্পের ‘জয়’ কেন সহজ নয়

স্টিভ উইটকফ কূটনৈতিক সমাধানের আশা ব্যক্ত করলেও ইরানের মতো কয়েক দশক ধরে অবরোধ সয়ে টিকে থাকা একটি দেশ কতটা নতি স্বীকার করবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় মাদুরোকে অপসারণের মাধ্যমে যে সামরিক উদ্দীপনা পেয়েছেন, ইরানে তা প্রয়োগ করা বিপজ্জনক হবে। ইরান কোনো ছোট রাষ্ট্র নয় যে একটি ঝটিকা অভিযানে সব শেষ হয়ে যাবে। বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি ট্রাম্পের নিজের প্রেসিডেন্সিকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীলতাকে একটি সহজ ‘বিজয়’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছেন, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এক ভিন্ন আশঙ্কার কথা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের রাজপথে বয়ে চলা সরকারবিরোধী উত্তাল ঢেউ এবং দেশটির নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটকে ওয়াশিংটন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখলেও, তেহরানের ৪৭ বছরের পুরনো আদর্শিক শাসনব্যবস্থা উল্টে দেয়া ট্রাম্পের জন্য মোটেও সহজ কোনো সমীকরণ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই দুর্বলতা ট্রাম্পকে উৎসাহিত করলেও একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভয়াবহতা হোয়াইট হাউসের জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হতে পারে।

সংঘাতের নতুন সমীকরণ ও সামরিক ঝুঁকি

জানুয়ারির শুরু থেকেই ইরানে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সরাসরি ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বা যুদ্ধের প্রস্তুতির বার্তা দিয়েছেন। তবে স্টিমসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ বারবারা স্লাভিনের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল। ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে তেহরান যে ধরনের ‘প্রতীকী’ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, এবার সরাসরি অস্তিত্বের সংকটে পড়লে তাদের পাল্টা আঘাত হবে বহুগুণ বিধ্বংসী।

অক্ষশক্তির পতন ও বর্তমান দুর্বলতা

ইরান বর্তমানে তার ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা তাদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা আঞ্চলিক মিত্রদের বলয় আজ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। হামাস ও হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি অভিযানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ঘটেছে এবং লাতিন আমেরিকার মিত্র ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর আটক হওয়া তেহরানকে কার্যত একা করে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবেও ইরান দেউলিয়া হওয়ার পথে; তাদের মুদ্রা রিয়ালের মান এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। আকাশসীমায় ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তেহরানকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে।

মানবিক হস্তক্ষেপ বনাম রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

বিক্ষোভকারীদের পক্ষে কথা বললেও ট্রাম্পের অবস্থানে এক ধরনের দোদুল্যমানতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের কারাগারে আটশ বন্দির ফাঁসি মওকুফের বিষয়টিকে ট্রাম্প নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করলেও বিক্ষোভ দমনে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর পর তিনি কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছেন। কুইন্স ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পার্সির মতে, ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় মাদুরোকে অপসারণের মাধ্যমে যে সামরিক উদ্দীপনা পেয়েছেন, ইরানে তা প্রয়োগ করা বিপজ্জনক হবে। ইরান কোনো ছোট রাষ্ট্র নয় যে একটি ঝটিকা অভিযানে সব শেষ হয়ে যাবে। বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি ট্রাম্পের নিজের প্রেসিডেন্সিকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি বলেন, ‘ইরানকে যুদ্ধ জিততে হবে না। তারা শুধু নিশ্চিত করবে যে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিই এক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে।‘

কূটনীতি নাকি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ?

ওয়াশিংটন এখন ইরানের সামনে যে চারটি শর্ত দিয়েছে—যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগের কথা রয়েছে। সেটিকে অনেকে কূটনীতির চেয়ে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কূটনৈতিক সমাধানের আশা ব্যক্ত করলেও ইরানের মতো কয়েক দশক ধরে অবরোধ সয়ে টিকে থাকা একটি দেশ কতটা নতি স্বীকার করবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের কট্টর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকরা বিদেশের মাটিতে আরেকটি ব্যয়বহুল যুদ্ধের চেয়ে অভ্যন্তরীণভাবে সমস্যার সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইরানের দুর্বলতা ট্রাম্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করলেও, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে টিকে থাকার লড়াই করবে। ফলে হোয়াইট হাউসের জন্য এ পথটি যতটা না বিজয়ের, তার চেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি কোনো বড় চুক্তির মাধ্যমে বিজয় দাবি করবেন, নাকি তেহরানের রাজপথের আন্দোলন নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা করবে—তা সময়ই বলে দেবে।

আরও