‘নির্মমতম নির্যাতন': মুক্ত ফিলিস্তিনিদের মুখে ইসরায়েলি কারাগারের ভয়াবহতা

তার কারাগারে থাকার সময়েই গাজায় ইসরায়েলি হামলায় তার স্ত্রী এবং একজন ছাড়া বাকি সব সন্তানই নিহত হয়েছেন।

‘বন্দীদের শরীরে মারধর ও নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল— যেমন কালশিটে, ফাটল, ক্ষত, মাটিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন এবং শক্ত করে বাঁধা হাতকড়ার দাগ।‘

সম্প্রতি ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীরা সেখানে তাদের ওপর হওয়া ‘নির্মমতম নির্যাতনের’ ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। হামাস পরিচালিত আক্রমণের পর ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে এবং সেখানে তাদের শারীরিক নিপীড়ন, চিকিৎসায় অবহেলা ও অনাহারের শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

দীর্ঘ ২২ মাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি থাকার পর ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বন্দির সঙ্গে মুক্তি পান ৩৩ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারী নাসিম আল-রাদি। মুক্তি দেয়ার ঠিক আগে ইসরায়েলি কারা রক্ষীরা তাকে 'বিদায়ী উপহার' হিসেবে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে মারধর করে।

রাদি জানান, দুই বছর পর গাজার দিকে তার প্রথম দৃষ্টি ছিল ঝাপসা। চোখের নিচে বুটের আঘাতের কারণে এখনো তার দৃষ্টিতে সমস্যা রয়েছে। গাজার বেইত লাহিয়া শহরের বাসিন্দা রাদিকে ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি স্কুলে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে আটক করে ইসরায়েলি সেনারা। কারাবাসের সময় তার প্রায় ১০০ দিন কেটেছে ভূগর্ভস্থ সেলে। তাকে কোনো অপরাধেই অভিযুক্ত করা হয়নি।

নেগেভ মরুভূমির নাফহা কারাগারে বন্দি ছিলেন রাদি। সেখানকার পরিবেশ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কারাগারের পরিস্থিতি ছিল চরম কঠোর। হাত-পা বাঁধা থেকে শুরু করে নির্মমতম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।‘ তিনি মারধরকে ব্যতিক্রম নয়, বরং নিপীড়নের একটি রুটিন মাফিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন।

রাদি বলেন— ‘তারা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করত, সঙ্গে চলত একটানা গালিগালাজ। সৈন্যরা কুকুর নিয়ে প্রবেশ করে আমাদের বলত, পেটের উপর শুয়ে পড়ো। এরপর চলত নির্দয়ভাবে মারধর।‘

রাদি আরো জানান, পাঁচজনের জন্য তৈরি কক্ষে ১৪ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হতো। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তার শরীরে ছত্রাকজনিত চর্মরোগ দেখা দেয়। তবুও কারাগার থেকে কোনো কার্যকর চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

২২ বছর বয়সী ছাত্র মোহাম্মদ আল-আসালিয়া। তিনি জাবালিয়ার একটি স্কুল থেকে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর আটক হন। তিনিও নাফহা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বন্দি থাকার সময় তার স্ক্যাবিস রোগ হয়েছিল।

আসালিয়া বলেন, ‘কোনো চিকিৎসা সেবা ছিল না। আমরা মেঝে পরিষ্কার করার তরল ওষুধ ক্ষতস্থানে লাগিয়ে নিজেদের চিকিৎসা করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তাতে অবস্থা আরো খারাপ হতো। তোশকগুলো ছিল নোংরা, পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো দুর্বল হয়েছে। খাবারও ছিল দূষিত।‘

তিনি আরো জানান— ইসরায়েলি সেনারা একটি এলাকাকে ‘দ্য ডিস্কো’ বলত, যেখানে একটানা দুই দিন ধরে উচ্চস্বরে গান বাজানো হতো। এটি ছিল তাদের সবচেয়ে কুখ্যাত ও বেদনাদায়ক নির্যাতনের একটি পদ্ধতি। বন্দিদের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো, ঠান্ডা বাতাস এবং পানি স্প্রে করা হতো তাদের ওপর। এবং কখনো কখনো মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয়া হতো।

বন্দি অবস্থায় রাদি ও আসালিয়া দুজনেরই ওজন কমেছে মারাত্মকভাবে। রাদি ৯৩ কেজি ওজন নিয়ে কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন এবং মুক্তির সময় তার ওজন দাঁড়ায় মাত্র ৬০ কেজি। আসালিয়ার ওজন ৭২ কেজি থেকে একসময় ৪২ কেজিতে নেমে আসে।

দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালের পরিচালক ইয়াদ কাদিহ জানান, সোমবার মুক্তিপ্রাপ্ত অনেক বন্দিরই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তিনি বলেন, ‘বন্দীদের শরীরে মারধর ও নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল— যেমন কালশিটে, ফাটল, ক্ষত, মাটিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন এবং শক্ত করে বাঁধা হাতকড়ার দাগ।‘

ইসরায়েলের মানবাধিকার গোষ্ঠী বি’ৎসেলেম বলছে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি এ ধরনের নির্যাতন একটি সরকারি নীতির অংশ। তবে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনী অতীতে দাবি করেছে যে, কারাগারের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে।

ইসরায়েলের একটি এনজিওর তথ্য মতে, প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফিলিস্তিনিকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে।

কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হলেও, মুক্তিপ্রাপ্ত রাদি চরমতম মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেন গাজায় ফিরে। তার কারাগারে থাকার সময়েই গাজায় ইসরায়েলি হামলায় তার স্ত্রী এবং একজন ছাড়া বাকি সব সন্তানই নিহত হয়েছেন।

রাদি বলেন, ‘আমি মুক্তি পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম, কারণ দিনটি আমার ছোট্ট মেয়ে সাবার তৃতীয় জন্মদিনের (১৩ অক্টোবর) সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তার প্রথম জন্মদিন পালন করতে পারিনি। তাই চেয়েছিলাম এবার একটি চমৎকার উপহার দিয়ে পুষিয়ে দেব। কিন্তু জানলাম, আমার পরিবারের সবার সঙ্গে সাবাও চলে গেছে। ওর সাথেই হারিয়ে গেল আমার সব আনন্দ।‘

আরও