মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে সামরিক হামলা বৈধ কি-না তা নিয়ে সন্দিহান মার্কিন সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। তাদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরুর জন্য ট্রাম্পের সাংবিধানিক এখতিয়ার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন আইনি সংকট তৈরি হবে। খবর সিএনএন।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ও গত মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে আটকের পর সাম্প্রতিক হামলায়ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ও সেই ক্ষমতার সীমা নিয়ে চলমান বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে।
হোয়াইট হাউজ এসব ঘটনায় জনসমক্ষে কোনো আইনি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেস সদস্যদের কাছে পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যাখ্যা দেননি বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আইনজীবী ক্রিস্টোফার অ্যান্ডার্স বলেন, ‘ইরানে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, যুদ্ধ ঘোষণা এবং মার্কিন সেনাদের যুদ্ধে পাঠানোর ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের।’
তিনি আরো বলেন, ‘কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট সেই ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার চেষ্টা করেছেন।’
মার্কিন সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, যুদ্ধ ঘোষণা বা অনুমোদনের ক্ষমতা শুধু কংগ্রেসের। জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও ক্যাটো ইনস্টিটিউটের গবেষক ইলিয়া সোমিন বলেন, ‘এটি স্পষ্টভাবে একটি যুদ্ধ। এ বিষয়ে আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। ট্রাম্প নিজেই একে যুদ্ধ বলেছেন।’
গতকাল ইরানে হামলার ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা আমাদের হত্যা করতে চায়। আমাদের সাহসী মার্কিন বীরদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, হতাহতের ঘটনাও ঘটতে পারে। যুদ্ধে এমনটা হয়। কিন্তু আমরা এটি করছি শুধু বর্তমান নয় ভবিষ্যতের জন্য। এটি একটি মহৎ অভিযান।’
যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হলেও ট্রাম্প ও তার পূর্বসূরি মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে আসছেন। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে বিদেশে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন প্রেসিডেন্ট।
২০২৪ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের দায়মুক্তি-সংক্রান্ত রায়ে ট্রাম্পের ক্ষমতার বিস্তৃত ব্যবহারের প্রতি উদার মনোভাব দেখা গেছে। গত বছর ইরানে হামলার সময় হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ওই সিদ্ধান্ত দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের আওতায় হয়েছে। আইনি বিশ্লেষণই এতে ভূমিকা রেখেছিল।
নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনায়ও সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ আংশিকভাবে আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সিল গোপন আইনি মতামত দেয়। সেখানে বলা হয়, বিদেশে আইনপ্রয়োগমূলক অভিযান চালাতে গিয়ে ট্রাম্প দেশীয় আইনে সীমাবদ্ধ নন।
মাদুরো অভিযান সংক্রান্ত ওই আইনি মতামতে আরো বলা হয়েছিল, অভিযানের পরিসর, ব্যাপ্তি ও সময়কাল সাংবিধানিক অর্থে ‘যুদ্ধ’-এর পর্যায়ে পড়ে না। তাই কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হয়নি।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে নতুন এ পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ‘পরিসর, ব্যাপ্তি ও সময়কালের’ প্রশ্নগুলো আবারো সামনে আসবে। হামলার ঘোষণা দিয়ে ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প সামরিক অভিযান ‘ব্যাপক ও চলমান’ বলে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বিশ্লেষক ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল সেন্টারের অধ্যাপক স্টিভ ভ্লাডেক বলেন, ‘এ ধরনের হামলার পক্ষে সাফাই গাইতে বিচার বিভাগ ক্রমেই দুর্বল যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। প্রায় সব যুক্তিই নির্ভর করেছে এ দাবির ওপর যে হামলাগুলো সীমিত এবং বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘নীতিগত নয় এটি যদি আইনি যুক্তি হয়, তবুও ইরান হামলার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া কঠিন।’
পানামায় স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক অভিযানে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। এরপর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার লিবিয়ায় বিমান হামলা এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরান ও সিরিয়ায় নেয়া পদক্ষেপে একই ধরনের আইনি বৈধতা দেখা যায়।
২০১৮ সালে সিরিয়ায় বিমান হামলার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সিল লিখেছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের পুলিশ নয়। কিন্তু তার ক্ষমতা যত বেড়েছে, আঞ্চলিক স্বার্থের পরিসরও তত বিস্তৃত হয়েছে এবং বিদেশে অস্থিতিশীলতা থেকে জাতীয় স্বার্থের প্রতি হুমকিও বেড়েছে।’
এছাড়া ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনই ২০০২ সালের ‘অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স অ্যাগেনস্ট ইরাক’ (এইউএমএফ) আইনের প্রয়োগ বারবার সম্প্রসারণ করেছে। ওই আইনটি ইরাক যুদ্ধের অনুমোদন দিয়েছিল। ৯/১১-পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযানে এ আইন ব্যবহার হয়, যদিও পরবর্তীতে মূল উদ্দেশ্যের বাইরে এর প্রয়োগ ঘটে।
ইলিয়া সোমিন বলেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে আমি কাঁদতাম না। এটি একটি ভয়াবহ শাসনব্যবস্থা, আমাদের শত্রু। কিন্তু যে যুদ্ধ এখানে শুরু হয়েছে, তা অসাংবিধানিক।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলায় শত শত ইরানি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও রয়েছেন। এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা উসকে দিয়েছে। এরই মধ্যে ইসরায়েলের পাশাপাশি কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।