লন্ডনের ঐতিহাসিক রাজপথ রিজেন্ট স্ট্রিটে গত ৯৯ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁ—নাম ‘ভীরাস্বামী’। তবে শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটেনের এ প্রাচীনতম ভারতীয় রেস্তোরাঁটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। বাড়িওয়ালার সঙ্গে আইনি লড়াই আর উচ্ছেদের খড়গের নিচে দাঁড়িয়ে রেস্তোরাঁটি বাঁচাতে এখন খোদ রাজা তৃতীয় চার্লসের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এর শুভানুধ্যায়ীরা।
১৯২৬ সালে যাত্রা শুরু করা ভীরাস্বামী কেবল একটি রেস্তোরাঁ নয়, এটি ব্রিটিশ-ভারতীয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। তবে রেস্তোরাঁটির মালিকপক্ষের সঙ্গে ভবনের মালিক ক্রাউন এস্টেটের লিজ নবায়ন নিয়ে বিরোধ চলছে। লন্ডনের ‘ক্রাউন এস্টেট’ (রাজপরিবারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, যার লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যায়) এ ভবনটি সংস্কার করে অফিসে রূপান্তর করতে চায়। তাদের দাবি, ভবনটির বর্তমান অবস্থা আধুনিক মানসম্মত নয় আর সংস্কার কাজ চলাকালীন রেস্তোরাঁটি চালু রাখা সম্ভব নয়। ফলে ভীরাস্বামীর লিজ নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ ও সমর্থকরা বলছেন, ভীরাস্বামীকে তার আদি স্থান থেকে সরিয়ে দেয়া মানে একটি বিশাল ইতিহাসকে মুছে ফেলা। এ নিয়ে বর্তমানে ব্রিটেনের আদালতে আইনি লড়াই চলছে।
ভীরাস্বামী কেবল সাধারণ ভোজনরসিকদের প্রিয় জায়গা নয়, এটি বিশ্বখ্যাত তারকা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মিলনমেলা। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও উইনস্টন চার্চিলের মতো নেতারা এখানে আহার করেছেন। এছাড়া চার্লি চ্যাপলিন, মার্লন ব্র্যান্ডো থেকে শুরু করে হালের প্রিন্সেস অ্যান বা ডেভিড ক্যামেরনও এখানকার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন।
বলা হয়, ভারতীয় ঝাল কারির সঙ্গে ঠান্ডা বিয়ার খাওয়ার যে ‘ব্রিটিশ সংস্কৃতি’ বর্তমানে জনপ্রিয়, তার শুরু হয়েছিল এখানেই। ১৯২০-এর দশকে ডেনমার্কের প্রিন্স এক্সেল এখানে এসে কারির সঙ্গে কার্লসবার্গ বিয়ার পানের রীতি চালু করেন।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ব্লিৎজ হামলার সময়ও এ রেস্তোরাঁটি বন্ধ হয়নি। ১৯৫৯ সালে ব্রিটেনের প্রথম তন্দুর ওভেনটি এখানে আনা হয়েছিল। ২০১৬ সালে নব্বই বছর পূর্তিতে মর্যাদাপূর্ণ মিশেলিন স্টার অর্জন করে ভীরাস্বামী।
রেস্তোরাঁটির সহ-মালিক রঞ্জিত মাথরানিসহ ১৮ হাজারের বেশি মানুষ একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের দাবি, রাজা চার্লস যেন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। সমর্থকদের মতে, ‘ভীরাস্বামী কেবল একটি রেস্তোরাঁ নয়, এটি ইন্দো-ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক। এটি রক্ষা করা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।’
বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে অবশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ ‘ক্রাউন এস্টেট’-এর বিষয়। তবে সমর্থকরা আশা ছাড়ছেন না। আগামী মার্চে রেস্তোরাঁটির শতবর্ষ উপলক্ষে বড় ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে নামি-দামি সেলিব্রিটিদের উপস্থিতিতে জনমত তৈরির চেষ্টা চলবে।
লন্ডনের বিখ্যাত সোফো সোসাইটির চেয়ারম্যান লুসি হেইন মনে করেন, ভীরাস্বামী বন্ধ হয়ে যাওয়া হবে লন্ডনের রন্ধনশিল্পের ঐতিহ্যের জন্য এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি। ২০২৩ সালে 'ইন্ডিয়া ক্লাব' নামক আরো একটি ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন ভীরাস্বামীকে টিকিয়ে রাখা ভোজনরসিকদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্রাউন এস্টেট বিকল্প জায়গা ও ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিলেও মালিক রঞ্জিত মাথরানি অনড়। তার মতে, ‘ভীরাস্বামী যেখানে আছে, সেখানেই তার প্রাণ।’
এখন আদালতের রায় ও রাজার সম্ভাব্য ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে, আগামী ২০২৬ সালে ভীরাস্বামী তার শততম জন্মদিন কি নিজের চেনা ঠিকানাতেই পালন করতে পারবে, নাকি স্মৃতি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।
বিবিসি অবলম্বনে