বিবিসি এক্সক্লুসিভ

ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্কে টানাপোড়েনের মাঝেও ইউক্রেন ইস্যুতে সমঝোতার সম্ভাবনা

যুদ্ধবিরতির আলটিমেটাম নিয়ে ট্রাম্প এতবার সময়সীমা বদলেছেন যে পুতিন তাকে সিরিয়াসলি নেন না। তিনি যতক্ষণ পারেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন, অথবা যদি ইউক্রেন আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয়, তবেই থামবেন।

নতুন করে তিক্ত হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্ক। রাশিয়ার একটি জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড পত্রিকা সম্প্রতি তাদের সম্পর্কের বর্ণনায় রেলগাড়ির উপমা টেনে বলেছে, ‘ট্রাম্প লোকোমোটিভ’ ও ‘পুতিন লোকোমোটিভ’ যেন বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা দুটি ট্রেন, সংঘর্ষ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই মুহূর্তে পুতিনের ট্রেন চলছে ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ পূর্ণগতিতে, অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অটল অবস্থানে। তিনি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতিতে ইচ্ছুক নন। আর ট্রাম্প তার ট্রেন চালাচ্ছেন রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশলে। আলটিমেটাম, নিষেধাজ্ঞার হুমকি, রাশিয়ার মিত্র দেশ ভারত ও চীনের ওপর শুল্ক আরোপসহ নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি রাশিয়ার কাছাকাছি দুটি মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন করেছেন।

ট্রেনের কাহিনী সাবমেরিনে গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সংঘর্ষের পথে নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি সপ্তাহে মস্কো সফরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। আর তার এই সফরের কারণেই অনেকেই মনে করছেন, সব উত্তেজনার মাঝেও ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে একটি সমঝোতা এখনো সম্ভব।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আগ্রাসনে রাশিয়ার নিন্দা করে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল ইউরোপীয় দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, যা ছিল রাশিয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক জয়।

সেই সময় দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে টেলিফোনে কথাবার্তায় পরস্পরের দেশে সফরের আলোচনা হয়। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন তখন মস্কোকে এড়িয়ে ইউক্রেনের ওপরই চাপ সৃষ্টি করছিল। এমনকি ইউক্রেন-যুদ্ধ ইস্যুতে কানাডা, ডেনমার্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়ান ট্রাম্প।

এই পরিস্থিতি ছিল রাশিয়ার জন্য স্বপ্নের মতো। রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের নিরাপত্তা গবেষণা কেন্দ্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কনস্টান্টিন ব্লোখিন তখন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ব্রাসেলস বা কিয়েভের চেয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বেশি মিল খুঁজে পাচ্ছে। এমনকি এপ্রিল মাসে রুশ পত্রিকা ‘ইজভেস্তিয়া’য় লেখা হয়েছিল, ‘ট্রাম্পবাদীরা হলো বিপ্লবী। তারা পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঘটাচ্ছে। পশ্চিমা ঐক্য আর টিকে নেই। ট্রাম্পবাদ ট্রান্সআটলান্টিক ঐকমত্যকে ধ্বংস করেছে।

স্টিভ উইটকফ তখন প্রায় নিয়মিতভাবে রাশিয়া সফর করছিলেন, দুই মাসে চারবার। পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকেও অংশ নেন। একবার পুতিন নিজ হাতে ট্রাম্পের একটি পোর্ট্রেট উইটকফের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে পাঠান। তাতে মুগ্ধ হয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্প সেই ছবির বদলে একটি চুক্তি চাচ্ছিলেন, ইউক্রেনে একটি নিঃশর্ত ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে যে রাশিয়া এখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তা বিশ্বাস করেন পুতিন। ফলে তিনি যুদ্ধ বন্ধে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ কারণেই ক্রমাগত বিরক্ত হচ্ছেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার হামলাকে ‘জঘন্য’, ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, পুতিন ইউক্রেন ইস্যুতে শুধু বাজে কথা বলেন। গত মাসে ট্রাম্প পুতিনকে যুদ্ধ থামানোর জন্য ৫০ দিনের আলটিমেটাম দেন। পরে তা কমিয়ে ১০ দিনে নামিয়ে আনেন। সময়সীমা এই সপ্তাহেই শেষ হবে। এখন পর্যন্ত পুতিন কোনো নমনীয়তা দেখাননি।

নিউ ইয়র্কের ‘দ্য নিউ স্কুল’ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নিনা খ্রুশ্চেভা মনে করেন, ট্রাম্প এতবার সময়সীমা বদলেছেন যে পুতিন তাকে সিরিয়াসলি নেন না। তিনি যতক্ষণ পারেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন, অথবা যদি ইউক্রেন আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয়, তবেই থামবেন।

এই অবস্থায় মনে হতে পারে ট্রাম্প-পুতিন সংঘর্ষ অনিবার্য। তবে বাস্তবতা একটু আলাদা। ট্রাম্প নিজেকে একজন ‘সেরা চুক্তিকারী’ হিসেবে ভাবেন। সবকিছুর পরও একটি সমঝোতা আনতে তিনি আশাবাদী। স্টিভ উইটকফ আবারও মস্কো সফরে যাচ্ছেন। তিনি এবার কী প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন তা অজানা। তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, এবার তিনি চাপ নয়, বরং প্রলুব্ধ করার মতো কিছু ‘লোভনীয় প্রস্তাব’ নিয়ে যাবেন।

মস্কোর এমজিআইএমও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক ইভান লোশকারেভ বলেছেন, আলোচনা চালিয়ে যেতে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কিছু সহযোগিতার প্রস্তাব আসতে পারে, যা ইউক্রেনে চুক্তির পর রাশিয়ার জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।

আরও