ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ইউনিট ৮২০০, প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফটের আজ্যুর ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিদিন কীভাবে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির মোবাইল ফোনকল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছে সেটাই ওঠে এসেছে দ্য গার্ডিয়ান, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা প্লাস ৯৭২ ম্যাগাজিন এবং হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘লোকাল কল’-এর যৌথ অনুসন্ধানে। প্রকল্পটি এতটাই ব্যাপক যে, সংশ্লিষ্টদের ভেতরে স্লোগান চালু হয়েছে—‘প্রতি ঘণ্টায় এক মিলিয়ন কল।‘
২০২১ সালের শেষের দিকে মাইক্রোসফট সিইও সত্য নাদেলার সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ইউনিট ৮২০০ প্রধান ইওসি সারিয়েলের একটি বৈঠক হয় যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে মাইক্রোসফট সদর দপ্তরে। সেখানে মাইক্রোসফটের আজ্যুর ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলের গোপন গোয়েন্দা ডেটা সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন সারিয়েল।
নাদেলা প্রকল্পটির প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতেন না— মাইক্রোসফট এমন দাবি করলেও গোপন নথি বলছে, তিনি ৭০% ডেটা স্থানান্তরকে সমর্থন দেন এবং বলেন, ‘এই অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।‘
মাইক্রোসফট সিইও সত্য নাদেলা। ছবি-রয়টার্স
২০১৫ সালে ‘লোন উলফ’ হামলার পর ইসরায়েলি গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন যে, আগের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের ওপর নজরদারি আর যথেষ্ট নয়। এরপর শুরু হয় পুরো জনগোষ্ঠীকে নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা।
আজ্যুরের ‘অসীম’ স্টোরেজ ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউনিট ৮২০০ প্রতিদিন গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে লক্ষাধিক ফোন কল রেকর্ড করতে থাকে। শুধু মেটাডেটা নয়, পুরো কথোপকথনই সংরক্ষিত হয়— যার মাধ্যমে গোয়েন্দারা আগে বা পরবর্তী সময়ে একজন ব্যক্তির কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করতে পারেন।
সূত্র বলছে, এই ফোনকল বিশ্লেষণ করে বোমা হামলার টার্গেটও নির্ধারণ করা হয়েছে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
প্রকল্পটির আরো একটি অংশ রয়েছে ‘নয়েজি মেসেজ’ নামে। ফিলিস্তিনিদের পাঠানো টেক্সট মেসেজ স্ক্যান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফিচারটি। এতে শব্দের ওপর ভিত্তি করে ‘সন্ত্রাসী ঝুঁকি’ নির্ধারণ করা হয়।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, এসব তথ্য ব্যবহার করে অভিযোগ ছাড়া আটক, ব্ল্যাকমেইল বা হত্যার পর তা বৈধতা দেয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, যখন কাউকে আটক করার প্রকৃত কারণ থাকে না, তখন এই ডেটার মধ্যেই ‘অজুহাত’ খুঁজে নেয়া হয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত, প্রায় ১১ হাজার ৫০০ টেরাবাইট ইসরায়েলি সামরিক ডেটা নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডে মাইক্রোসফট সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেই ডেটায় আছে ২০ কোটিরও বেশি ঘন্টার অডিও ফাইল।
উত্তর ইসরায়েলের লেবানন সীমান্তসংলগ্ন কিবুৎস মিসগাভ আম-এর একটি পর্যবেক্ষণ চৌকির কাছে ইউনিট ৮২০০-এর একটি সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কেন্দ্র অবস্থিত। ছবি- গার্ডিয়ান
মাইক্রোসফটের দাবি, এই ডেটাগুলোর সত্যিকার প্রকৃতি কী তা তারা জানে না। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে মাইক্রোসফট ইঞ্জিনিয়াররা ইউনিট ৮২০০-এর সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করেছে। এমনকি, প্রকল্পটি এতটাই গোপন ছিল যে কর্মীদের ইউনিট ৮২০০-এর নাম পর্যন্ত ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে প্রথম এই খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকে মাইক্রোসফটের ভেতরে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মে মাসে এক কর্মী মাইক্রোসফট প্রধান নাদেলার বক্তৃতার মাঝেই বলে ওঠেন, ‘আজ্যুর দিয়েই যে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ চলে— সেটা নিয়ে কিছু কিছু দেখাবেন না?’
মাইক্রোসফট পরে এক পর্যালোচনা করে জানায়, তাদের সিস্টেম ব্যবহার করে কাউকে ‘টার্গেট বা ক্ষতিগ্রস্ত’ করার কোনো প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু ইউনিট ৮২০০ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এই সিস্টেম নিয়মিতভাবে হামলা পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয়েছে।
এই যুদ্ধ চলাকালীন গাজায় ৬০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ হাজারের বেশি শিশু। স্থানীয় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসস্তুপে রূপ নিলেও আগে সংরক্ষিত কল ডেটা আজও গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সামরিক কর্মকর্তারা এখন বিশ্বাস করেন যে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি চলছে, এবং এই নজরদারি সিস্টেম তারই অংশ।