গত শনিবার ভোরে ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করে মার্কিন বাহিনী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে বইছে নিন্দার ঝড়। তবে সবথেকে বড় প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়িয়েছে—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে অন্য দেশের সামরিক বাহিনী এভাবে কি আটক করতে পারে? এর আইনি ভিত্তি কী এবং এটি কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয়?
মার্কিন বিচার বিভাগ ও ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এটি কোনো সামরিক আক্রমণ নয়, বরং একটি ‘ল এনফোর্সমেন্ট অপারেশন’ বা অপরাধী ধরার অভিযান। নিউইয়র্কের একটি গ্র্যান্ড জুরি মাদুরো ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আগেই পরোয়ানা জারি করেছিল।
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘আসামিদের আমেরিকার মাটিতে আমেরিকান আদালতেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।‘ ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, মাদুরো একটি ‘নারকো-স্টেট’ বা মাদক রাষ্ট্র চালাচ্ছিলেন, যা আমেরিকার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বলপ্রয়োগ বা হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সে সঙ্গে, আন্তর্জাতিক আইনে কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থে অন্য দেশে হামলা চালানো যায়। কিন্তু মাদুরোর সরকার আমেরিকার ওপর কোনো সরাসরি সামরিক হামলা করেনি। মাদক পাচারকে সাধারণত ‘সশস্ত্র যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
এছাড়া, মার্কিন সংবিধানে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু এই অভিযানের আগে কংগ্রেসকে কিছুই জানানো হয়নি, যা খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ আইনেরও লঙ্ঘন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস গত বছর ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভেনিজুয়েলায় স্থলভিত্তিক কোনো অভিযান অনুমোদনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সম্মতি প্রয়োজন হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, শনিবারের অভিযানের আগে কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরেমি পলের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখানে বড় ধরনের স্ববিরোধিতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘আপনি একই সঙ্গে বলতে পারেন না যে এটি অপরাধী ধরার একটি সাধারণ আইনি প্রক্রিয়া এবং আবার বলতে পারেন না যে আমরা এখন ভেনেজুয়েলা শাসন করব। এটা সম্পূর্ণ অর্থহীন।‘
আন্তর্জাতিক আইন সাধারণত অন্য দেশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করে, কেবল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আত্মরক্ষার মতো সীমিত ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচার বা গ্যাং সহিংসতা সশস্ত্র সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হয় না, যা সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে পারে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জাতীয় নিরাপত্তা আইন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যানও মার্কিন অভিযানের আইনি ভিত্তির পক্ষে অবস্থান নেননি। তিনি বলেন, ‘শুধু ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিদেশী সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বৈধতা নেই। প্রশাসন সম্ভবত এটিকে আত্মরক্ষার তত্ত্বে ব্যাখ্যা করতে চাইবে।‘
ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৮৯ সালে পানামার জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেফতারের ঘটনার উদাহরণ টানছে। তবে সেখানে আমেরিকার নাগরিক নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং পানামা খালের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো জড়িত ছিল। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। যদিও আমেরিকা ২০১৯ সাল থেকে মাদুরোকে ‘অবৈধ নেতা’ মনে করে, কিন্তু তার বদলে এমন কাউকে তারা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি যিনি এই সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিতে পারতেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অবৈধ হতে পারে, কিন্তু আমেরিকাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার মতো কোনো কার্যকর ক্ষমতা বর্তমানে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার নেই। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যানের মতে, ‘আমেরিকা সম্ভবত এটিকে আত্মরক্ষার তত্ত্ব দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা করবে, যদিও তা ধোপে টিকবে না।‘