সিএনএন

মাদুরো পরবর্তী ভেনিজুয়েলা: যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে তেলসম্পদের ভবিষ্যত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলা থেকে সরে যায়। ফলে দেশটিতে নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে

ভেনিজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া ও দেশটির ধ্বংসপ্রায় তেল শিল্প পুনর্গঠনে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদুরো সরকারের পতনের পর আপাতত ভেনিজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রই পরিচালনা করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার মজুতে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এ বিপুল তেলভাণ্ডার দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করে তেল অবকাঠামো সংস্কারে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। তার ভাষায়, ‘ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তেল অবকাঠামো মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করা হবে।’

ভেনিজুয়েলায় তেল উৎপাদন বন্ধ কেন

বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনিজুয়েলায় তেল উৎপাদন গত এক দশকে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একসময় দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনকারী দেশটি বর্তমানে উৎপাদন করছে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল। যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলা থেকে সরে যায়। ফলে দেশটিতে নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

দেশটির তেল অবকাঠামোর বড় অংশ ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে আধুনিকায়ন করা হয়নি। পাইপলাইন, রিফাইনারি ও উৎপাদনক্ষেত্রের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের দেশত্যাগও উৎপাদন হ্রাসের বড় বড় ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তি হালনাগাদ সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুল তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়েছে।

অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল ব্যয়

রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএর হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে তেল অবকাঠামো সংস্কারে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পেলেও উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে।

বিশ্ববাজারে প্রভাব সীমিত

বর্তমানে ভেনিজুয়েলার উৎপাদন মাত্রা এত কম যে, তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ বছর ওপেক উৎপাদন বাড়ালেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে চাহিদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার জাহাজ থেকে তেল জব্দ শুরু করার সময় যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের ওপরে উঠলেও পরে তা আবার ৫৭ ডলারে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত সুবিধা

ভেনিজুয়েলার তেল মূলত ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ, যা ডিজেল ও শিল্প জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রিফাইনারি এ ধরনের তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে নির্মিত। ফলে ভেনিজুয়েলার তেল পুনরায় বাজারে এলে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।

আরও