ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধবিরতির নাজুক পরিস্থিতি ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আবারো বৈশ্বিক নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পারমাণবিক অস্ত্র।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর বিমান হামলা ও সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ, অবস্থান এবং এর ভূরাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এরই মধ্যে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) সতর্ক করে বলছে, বিশ্ব একটি নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে—যেখানে বিভিন্ন দেশ নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ বা আধুনিকীকরণে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—পারমাণবিক নিরুৎসাহিতকরণ নীতিমালা কতটা কার্যকর এবং বর্তমান কৌশলগুলো আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধ ধাঁচের প্রতিযোগিতা ঠেকাতে যথেষ্ট কিনা।
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে বিশ্বে আনুমানিক ১২ হাজার ২৪১টি পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ। বাকি অংশের মালিক ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরায়েল।
এ অস্ত্রভাণ্ডারের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি ওয়ারহেড সক্রিয় সামরিক মজুদে রয়েছে। তার মধ্যে ৩ হাজার ৯০০টির মতো ওয়ারহেড মাঠে মোতায়েন করা আছে। অর্থাৎ, সেগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা বোমার বহরসহ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় সংরক্ষিত।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের পারমাণবিক মজুদের আকার নিয়মিত প্রকাশ করে। তবে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে এ তথ্য গোপন থাকে। গত কয়েক বছরে পারমাণবিক স্বচ্ছতা হ্রাস পেয়েছে; ফলে গবেষকরা এখন স্যাটেলাইট চিত্র, উন্মুক্ত উৎসের তথ্য ও গোপন সূত্রের ওপর বেশি নির্ভর করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র অনুমিত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ইসরায়েল। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘কৌশলগত গোপনীয়তা’ বজায় রাখে। তবে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, দেশটির হাতে প্রায় ৯০টি পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে।
যদিও পারমাণবিক অস্ত্র কেবল নয়টি দেশের মালিকানায় রয়েছে, তবু আরো ছয়টি দেশ এ ধরনের অস্ত্র নিজেদের ভূখণ্ডে রাখে। ন্যাটোর পারমাণবিক ভাগাভাগি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার ওয়ারহেড জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও তুরস্কে মজুদ করেছে। যদিও এসব অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকে, তবে মিত্রদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে সেগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোয় মজুদ রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক নিরুৎসাহন বিশেষজ্ঞ লুকাশ কুলেসা বলেন, ‘এই ব্যবস্থার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রয়োজন পড়ে না। এতে করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকে।’
রাশিয়াও এখন এই পথে হাঁটছে। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেলারুশে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। যদিও মিনস্ক দাবি করেছে, অস্ত্র সরবরাহ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তব মোতায়েনের সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
শীতল যুদ্ধকালে বিশ্বের পারমাণবিক ওয়ারহেড সংখ্যা এক সময় ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে নিরস্ত্রীকরণের ধারা চলে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সে ধারা থেমে যেতে পারে।
সিপ্রির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘একটি নতুন গুণগত পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে।’ ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও অন্যান্য ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পারমাণবিক নিরুৎসাহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
কুলেসা বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি শত্রু রাষ্ট্র কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে পারেনি। একইভাবে, রাশিয়ার পারমাণবিক হুমকিও ন্যাটোকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দিতে নিবৃত্ত করতে পারেনি।
তার মতে, ‘পারমাণবিক নিরুৎসাহিতকরণে প্রচলিত কৌশল ভ্রান্ত। প্রতিরক্ষা জোরদার করতে গিয়ে একপক্ষ অস্ত্র বাড়ালে, অপর পক্ষও তার জবাব দেয়। এটি এক ধরনের ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন পারমাণবিক অস্ত্রের কেবল উপস্থিতিই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিশ্ব আরো বিপজ্জনক এক যুগে প্রবেশ করতে পারে—যেখানে ভুলের সুযোগ থাকবে খুবই কম।