ফুটবল মাঠ থেকে মাদকচক্রে

আর্সেনালের তরুণ প্রতিভা এখন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী

২০০৯ সালে আর্সেনালের যুবদলের অধিনায়ক হিসেবে এফএ ইয়ুথ কাপ জিতে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান ইমানুয়েল-থমাস।

ধরা পড়া দুই নারীর কাছ থেকে আদালত শুনেছে, ইমানুয়েল-থমাস তাদের প্রতারিত করে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল ২,৫০০ পাউন্ড আর বিলাসবহুল ছুটির প্যাকেজ।

প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবল ক্যারিয়ারের একসময়ের উজ্জ্বল নাম জে ইমানুয়েল-থমাস। আর্সেনালের কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার তার সম্পর্কে একসময় বলেছিলেন, সে ‘যেকোনো’ জায়গায় খেলতে পারে। সেই ফুটবলারের ভবিষ্যৎ যেন চোখধাঁধানোই ছিল। শক্তিশালী গড়ন, দক্ষ কৌশল আর চমৎকার গতির সমন্বয়ে গড়া এই স্ট্রাইকার ছিলেন প্রিমিয়ার লিগের উদীয়মান তারকা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—যে ক্যারিয়ারে ছিল সম্ভাবনার ছড়াছড়ি তা রূপ নেয় ব্যর্থতার এক করুণ গল্পে। প্রিমিয়ার লিগের বদলে তিনি বারবার ঘুরেছেন ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের ক্লাবগুলোতে। ২০২০ সালে তিনি পাড়ি জমান স্কটল্যান্ডে।

আর্সেনালের জার্সিতে জে ইমানুয়েল-থমাস। ছবি: আর্সেনাল ডটকম

তবে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, গ্লাসগোর কাছাকাছি গুরক শহরে নিজের বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন তিনি। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে দুই মহিলাকে থামিয়ে তাদের ব্যাগে ৬ লাখ পাউন্ড মূল্যের গাঁজা খুঁজে পায় বর্ডার ফোর্স। তদন্তকারীরা দ্রুতই এই ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পান ইমানুয়েল-থমাসের সঙ্গে।

২০০৯ সালে আর্সেনালের যুবদলের অধিনায়ক হিসেবে এফএ ইয়ুথ কাপ জিতে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান ইমানুয়েল-থমাস। সেই দলে ছিলেন জ্যাক উইলশার ও ফ্রাঁসিস কোকেলাঁর মতো নামও। প্রতিযোগিতার প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছিলেন তিনি।

তবে সিনিয়র দলে সুযোগ পেলেও নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি। ধারে খেলেছেন একাধিক ক্লাবে, এরপর চুক্তিবদ্ধ হন ইপসউইচ টাউনে। পরে ব্রিস্টল সিটিতে খেলে চ্যাম্পিয়নশিপে দলকে উন্নীত করেন এবং হয়ে ওঠেন সমর্থকদের প্রিয়। তবে এরপর তার ক্যারিয়ারে শুরু হয় পতনের ধারা। কিউপিআর, এমকে ডনস, গিলিংহ্যামের মতো ক্লাব ঘুরে ২০১৯ সালে পাড়ি জমান থাইল্যান্ডের পিটিট রায়ং ক্লাবে। সেই ক্লাবও একই বছর বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই জড়িয়ে পড়েন মাদকের দুনিয়ার সঙ্গে।

ইংল্যান্ডে ফিরে এসেও তিনি সংযোগ রাখেন সেই অপরাধচক্রের সঙ্গে। গ্রিনক মোরটন ক্লাবে মাত্র ছয় মাসের চুক্তিতে যখন খেলছিলেন তিনি, সে সময়ই চলছিল তদন্ত। ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মাঠে নামেন কুইন্স পার্কের বিপক্ষে, কিন্তু জানতেন হয়তো এটাই ছিল শেষ।

ধরা পড়া দুই নারীর কাছ থেকে আদালত শুনেছে, ইমানুয়েল-থমাস তাদের প্রতারিত করে মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিল ২,৫০০ পাউন্ড আর বিলাসবহুল ছুটির প্যাকেজ।

জে ইমানুয়েল-থমাস। ছবি: আর্সেনাল ডটকম

বিজনেস ক্লাসের বিমানে থাইল্যান্ড থেকে দুবাই হয়ে লন্ডনে ফিরছিলেন তারা। কিন্তু তাদের ব্যাগে ভ্যাকুয়াম করা গাঁজার প্যাকেট ছিল, যার বাজারমূল্য ৬ লাখ পাউন্ড। তারা কিছুই জানতেন না। এমনকি আগেও একবার ঠিক একই কায়দায় তারা লন্ডন ফিরে এসেছিলেন জুলাই মাসে।

ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি জানায়, ইমানুয়েল-থমাস ছিলেন থাই সরবরাহকারী ও ব্রিটিশ ডিলারদের মধ্যস্থতাকারী। আদালতে বলা হয়— ফ্লাইট, রুট এবং এয়ারপোর্ট-সংক্রান্ত ব্যাপক গবেষণা করেছিলেন ইমানুয়েল-থমাস।

গ্রেফতারের পর এনসিএ কর্মকর্তাদের তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েদের কথা ভেবে খারাপ লাগছে।‘

জেল থেকে ভিডিও লিঙ্কে আদালতে হাজির হয়ে শুরুতে দায় অস্বীকার করলেও মে মাসে অবশেষে দোষ স্বীকার করেন ইমানুয়েল-থমাস। তারপরই মামলার তথ্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। মামলার ব্যাপক তদন্তের পর দুই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। কারণ তারা প্রতারিত হয়েছিলেন বলে প্রমাণ মেলে।

বর্তমানে ইমানুয়েল-থমাস রয়েছেন এইচএমপি চেমসফোর্ডে। শিগগিরই তার শাস্তির রায় ঘোষণা করা হবে।

২০০৯ সালের এক স্বর্ণালী বিকালে যার হাতে ছিল ট্রফি, যার দিকে তাকিয়ে ছিল ভবিষ্যৎ—আজ তার নাম উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোচনায়। ফুটবলের আশা থেকে অপরাধের অন্ধকারে, জে ইমানুয়েল-থমাসের জীবন যেন এক করুণ রূপান্তরের প্রতিচ্ছবি।


বিবিসি অবলম্বনে

আরও