দুইটি গুলির শব্দ।
১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর রাতে ঘটে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডকে এভাবেই বর্ণনা করেন কোরিয়া সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (কেসিআইএ) প্রাক্তন নিরাপত্তারক্ষী ইউ সিওক-সুল।
সেদিন রাত ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি পার্ক চুং-হি তার বিশ্বস্ত সহযোগীদের নিয়ে ‘সেফ হাউসে’ নৈশভোজে বসেছিলেন। হঠাৎই গুলি চালান কেসিআইএ প্রধান কিম জে-গিউ। পার্কের দীর্ঘদিনের এই বন্ধু তারই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন।
কিমের গুলিতে নিহত হন প্রেসিডেন্ট পার্ক, যিনি ১৮ বছর ধরে একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে আসছিলেন। সেই রাতে পার্কের নিরাপত্তারক্ষী এবং কেসিআইএর শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট হত্যার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরু হয় তীব্র অস্থিরতা। কিম জে-গিউকে অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৯৮০ সালের মে মাসে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। তাঁর সঙ্গে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরো কয়েকজনকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
৪৬ বছর পর কিমের পরিবার পুনর্বিচারের আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। পরিবারের দাবি, কিম কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতালোভে রাষ্ট্রপতি হত্যা করেননি, বরং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এই ‘দুঃখজনক সিদ্ধান্ত’ নিয়েছিলেন।
কিম জে-গিউ (বামে) এবং পার্ক চুং-হি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ছবি- ন্যাশনাল আর্কাইভ অব কোরিয়া
কেসিআইএর নির্যাতন, ভুয়া অভিযোগ, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাসের জন্য কিম নিজেও বিতর্কিত ছিলেন। তবুও তিনি আদালতে বলেছিলেন—রাষ্ট্রপতি পার্ক দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যা রোধ করাই তার উদ্দেশ্য ছিল।
‘আমি আমার জীবন ভিক্ষা করতে চাই না। কারণ আমি এমন একটি আদর্শ খুঁজে পেয়েছি, যার জন্য মৃত্যুও সার্থক,’—কোর্টে কিমের এই কথাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তৎকালীন সামরিক শাসক চুন দু-হোয়ান কিমের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ আনেন। তবে কিমের পরিবার এবং তার পক্ষে আইনজীবীরা বলছেন, হত্যা সংঘটিত হয়েছিল সামরিক আইন ঘোষণার আগে। ফলে সামরিক আদালতে বিচারের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।
আইনজীবী লি স্যাং-হি বলেন, ‘প্রতিবাদীদের গুলি করার বিরোধিতা করেছিলেন কিম। তিনি বলেছিলেন, এক লাখ মানুষ মারা গেলেও গণবিপ্লব থামবে না।‘
তবে সমালোচকরা মনে করেন, কিমের পরিকল্পনা সুপরিকল্পিত ছিল না। গুলি চালনার পরও তিনি কেসিআইএ সদর দফতরে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টা করেননি। বরং এটি ছিল এক হতাশ, ক্ষুব্ধ মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রপতি হত্যার মাধ্যমে কিম কি আসলে কোনো গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ খুলেছিলেন, নাকি শুধু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত অধ্যায় রচনা করেছিলেন?
কিমের বোন কিম জং-সুক বলেন, ‘আমার ভাই ক্ষমতার জন্য এমন কাজ করতে পারেন না। তিনি সৎ মানুষ ছিলেন।‘
১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘটে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। তখন উজ্জ্বল হয় পার্ক চুং-হির ভাবমূর্তি। তার মেয়ে পার্ক গিউন-হে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে তার অপসারণ ও কারাদণ্ড ইতিহাসের চক্রকেই নতুন মোড় দেয়।
কিমের পরিবারের আশা, এই পুনর্বিচার অন্তত তার কর্মকাণ্ডকে নতুন আলোয় বিচার করবে।
কিম আদালতে বলেছিলেন, ‘আমি জানি, এ গুলি আমার মৃত্যুর কারণ হবে। কিন্তু আমি ইউসিন (একনায়কতন্ত্র)-এর বুকে গুলি চালিয়েছি এক বুনো জন্তুর হৃদয় নিয়ে।‘
সেই গুলি কি সত্যিই ছিল গণতন্ত্রের বার্তা? নাকি এক ক্ষমতালোভীর চূড়ান্ত প্রতিহিংসা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে আদালতে।