রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দিয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এখন পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ১১৮ জন নেপালি নাগরিক নিহত এবং ১৩২ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়েছে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কনস্যুলার সেবাসংক্রান্ত দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আরো ২১৯ জন নেপালি এই যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়েছেন। রুশ কর্তৃপক্ষের পাঠানো আনুষ্ঠানিক বার্তার ভিত্তিতে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নেপাল কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও প্রেরণের কাজ করে যাচ্ছে। খবর দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই শত শত নেপালি তরুণ রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। উচ্চ বেতন এবং দ্রুত নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতির লোভে অনেকেই রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি হন। ইউক্রেনে ব্যাপক হতাহতের পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিদেশী নাগরিক নিয়োগের নীতি চালু করেন, যেখানে মাসিক প্রায় তিন লাখ রুবল বেতন এবং মাত্র এক বছরের সামরিক সেবা শেষে সরাসরি রুশ নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।
অফিসিয়াল তথ্য না থাকলেও অনুমান করা হয়, প্রায় দেড় হাজার নেপালি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। এদের অনেকেই ভারত, উপসাগরীয় দেশ বা মালয়েশিয়া হয়ে অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক পথে রাশিয়ায় পৌঁছেছে। রাশিয়ায় অধ্যয়নরত কিছু শিক্ষার্থীও সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানা যায়।
যুদ্ধ শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন গোরখার সঞ্জিত ভট্ট। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র এক মাস আগে তিনি পড়াশুনার জন্য কিয়েভে পৌঁছেছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে তিনি পায়ে হেঁটে দেশ ছাড়েন। তার কথায়, ‘পাঁচ দিন হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের পথ ধরে পোলিশ সীমান্তে পৌঁছাই। চারদিকে বিশৃঙ্খলা, কেউ কাউকে সাহায্য করার মতো অবস্থা ছিল না।‘
অন্যদিকে, বিপরীত স্রোতে অনেক নেপালি তখন রাশিয়ার দিকে রওনা দিচ্ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নাম লেখানোর উদ্দেশ্যে। দাইরেখের প্রকাশ বোহরা জানান, তিনি স্টুডেন্ট ভিসার নাম করে দালালের কাছে দশ লাখ রুপি দেন এবং পরিবারকে কিছু না জানিয়ে রাশিয়ায় পৌঁছান। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই তাকে সেনাবাহিনীতে নেয়া হয় এবং এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পরই পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।
সাম্প্রতিক হতাহতদের মধ্যে রয়েছেন রাউতাহাট জেলার ৪৫ বছর বয়সী মান বাহাদুর তামাং, যিনি ১০ ফেব্রুয়ারি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের দাবি, সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি তার মৃত্যুর খবর। দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর তার স্ত্রী এক সহযোদ্ধার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।
এদিকে যারা রুশ নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেও অনেক নেপালি এখনো সামনের সারিতে যুদ্ধ করে চলেছেন। তিন বছর ধরে রুশ সেনাবাহিনীতে থাকা জনম রাই জানান, তিনি ও তার কয়েকজন সঙ্গী দেশে ফিরতে চাইলেও অনুমতি মেলেনি। তার ভাষায়, ‘আমরা দেশে ফিরতে চাই, কিন্তু অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন নেপালি রিক্রুটদের আসা কিন্তু থেমে নেই।‘
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশেই মানবিক ও ভৌগোলিক ক্ষতি বাড়ছে। কিন্তু নেপালের বহু পরিবারের জন্য এই যুদ্ধ এখন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে—প্রিয়জন হারানো, আত্মীয়স্বজন নিখোঁজ, আর কবে বা আদৌ তারা ফিরে আসবেন কিনা তার কোনো পরিষ্কার উত্তর নেই।