মানবাধিকার প্রতিবেদন সংকুচিত করে পুনরায় লিখেছে ট্রাম্প প্রশাসন

'ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দশক ধরে চলা মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মূলনীতিগুলো ত্যাগ করার শামিল।'

প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ ছিল বলে শোনা গেছে। তাছাড়া, বছরের শুরুতে রিপাবলিকান নেতারা কিছু নির্দেশনা জারি করেছিলেন। প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত করা এবং দুর্নীতি ও লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের মতো বিষয়গুলো কম উল্লেখ করার কথা ছিল সেই নির্দেশনায়।

বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদন সংকুচিত করে পুনরায় লিখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। খবর বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবাধিকার প্রতিবেদনটি সাধারণত বিশ্বের কোনো সরকারের তৈরি সবচেয়ে বিস্তৃত মানবাধিকার বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচিত হতো। পুনর্লিখিত প্রতিবেদনে কিছু মিত্র দেশ যেমন ইসরায়েল ও এল সালভাদরের সমালোচনা কমানো হয়েছে। আবার ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর সমালোচনা বাড়ানো হয়েছে।

পূর্ববর্তী বছরের প্রতিবেদনের অনেক বিভাগও এবার বাদ দেয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি দুর্নীতি এবং এলজিবিটিকিউ প্লাস ব্যক্তিদের ওপর হয়রানি সম্পর্কিত বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে ওঠে আসেনি।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেদনটি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য হলো ‘অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি’ দূর করা এবং এর পঠনযোগ্যতা বাড়ানো।

প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি মিত্র দেশ যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অনলাইনে ‘হেইট স্পিচ’ বা ঘৃণামূলক বক্তব্য সংক্রান্ত নীতিমালার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত। ট্রাম্প প্রশাসন এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয়রা এর আগে যেভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন, এ প্রতিবেদনের ভাষার ধরনও তার সঙ্গে মিলে গেছে। মূলত ট্রাম্প প্রশাসন ও প্রযুক্তি খাতের নেতাদের ধারণা, অনলাইনে ক্ষতি কমানোর জন্য প্রণীত কিছু ইউরোপীয় আইন স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য হুমকি।

মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের প্রাক্তন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উজরা জেয়া অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দশক ধরে চলা মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মূলনীতিগুলো ত্যাগ করার শামিল।

প্রতিবেদনে বেশ কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যুতে’ যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। ‘মুক্ত মত প্রকাশে গুরুতর সীমাবদ্ধতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ও আছে সেখানে। এতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বিচার এবং শাস্তির প্রক্রিয়াও যুক্তরাজ্যে অপর্যাপ্ত ও অসঙ্গতিপূর্ণ। তবে যুক্তরাজ্য সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘মুক্ত মত প্রকাশ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য এবং আমরা আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষার পাশাপাশি এই স্বাধীনতাগুলো রক্ষা করতে পেরে গর্বিত।‘

প্রতিবেদনে ব্রাজিলকে ‘মুক্ত মত প্রকাশে অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ’ গ্রহণের জন্যও সমালোচনা করা হয়েছে। তবে ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্য পূর্বেও এই ধরনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ইসরায়েল, পশ্চিম তীর এবং গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘর্ষের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের রিপোর্ট বেড়েছে। তবে যেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের চিহ্নিত করার জন্য সরকার বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হামাস এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। উভয় পক্ষই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাস কমান্ডারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার উল্লেখও নেই প্রতিবেদনে।

এল সালভাদরের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেফতার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বন্দিদের ‘অমানবিক’ পরিবেশে রাখার অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উল্লেখযোগ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট নেই।‘

উল্লেখ্য, এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ট্রাম্পের। গত এপ্রিলে বুকেলেকে ‘অসাধারণ প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘চমৎকার কাজ করছেন’ বলে প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প।

এই প্রতিবেদন প্রকাশ হতেও কয়েক মাস দেরি হয়েছে। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ ছিল বলে শোনা গেছে। তাছাড়া, বছরের শুরুতে রিপাবলিকান নেতারা কিছু নির্দেশনা জারি করেছিলেন। প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত করা এবং দুর্নীতি ও লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের মতো বিষয়গুলো কম উল্লেখ করার কথা ছিল সেই নির্দেশনায়।

এছাড়াও, ট্রাম্প এ বছরের শুরুতে সৌদি আরব ভ্রমণে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকারীদের সমালোচনা করে বলেন, কীভাবে জীবনযাপন বা নিজ দেশ পরিচালনা করতে হয়— মার্কিন সরকার আর তা কাউকে শেখাবে না ।

আরও