উভয় পক্ষেই ব্যাপক হতাহতের দাবি

পাকিস্তান সীমান্তে হামলার ঘণ্টাখানেক পর কাবুলে বিমান হামলা

কাবুলে আজ ভোরে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে রাজধানীর ঠিক কোন স্থানে হামলা হয়েছে বা হতাহতের সংখ্যা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ জানান, দক্ষিণের কান্দাহার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিয়া প্রদেশেও বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের চলমান উত্তেজনা ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে’ গড়িয়েছে। পাকিস্তান সীমান্তে হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আজ ভোরে আফগান রাজধানী কাবুলসহ আরো দুটি প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসলামাবাদ। এ তথ্য জানিয়েছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সহিংসতা নতুন করে তীব্র আকার নেয়ায় কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি আরো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। খবর এপি।

কাবুলে আজ ভোরে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে রাজধানীর ঠিক কোন স্থানে হামলা হয়েছে বা হতাহতের সংখ্যা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ জানান, দক্ষিণের কান্দাহার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিয়া প্রদেশেও বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, দেশটির সামরিক বাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য হতাহতের বিষয়ে তারা কিছু বলেননি।

আফগানিস্তান জানায়, গত রোববার সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রাণঘাতী বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তারা পাকিস্তানে হামলা চালায়। একইসঙ্গে এক ডজনের বেশি পাকিস্তানি সেনা পোস্ট দখলের দাবি করে।

গত সপ্তাহের হামলাকে ওই এলাকায় আশ্রয় নেয়া জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান বলে বর্ণনা করেছিল ইসলামাবাদ। গতকালের আফগান হামলাকে ‘উসকানিবিহীন’ বলে অভিহিত করেছে এবং সেনা পোস্ট বেহাত হওয়ারও দাবি নাকচ করেছে।

এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। মতপার্থক্য কূটনৈতিকভাবে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

গতকাল রাতে এক্স পোস্টে জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বারবার আক্রমণ ও অনুপ্রবেশের জবাবে ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো হয়েছে।’

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ছয়টি সীমান্ত প্রদেশে পাল্টা হামলা হয়েছে।

২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাক-আফগান সীমান্তকে ডুরান্ড লাইন বলা হয়, যা আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই পক্ষের দেয়া হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আফগানিস্তানে নেয়া হয়েছে এবং আরো কয়েকজনকে জীবিত আটক করা হয়েছে। নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়ে তারা বলেছে, ৮ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছে। কাবুলের দাবি, ১৯টি পাকিস্তানি সেনা পোস্ট ও দুটি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। হামলা শুরুর প্রায় চার ঘণ্টা পর মধ্যরাতে লড়াই শেষ হয়।

অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে নিহত ২ এবং আহত হয়েছেন ৪ জন। তার দাবি, ৩৬ জন আফগান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। এক্সে তিনি লেখেন, আফগানিস্তানের ‘উসকানিবিহীন গুলিবর্ষণের’ জবাবে পাকিস্তান ‘দৃঢ় ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া’ দেখাচ্ছে।

পাকিস্তানি সেনা আটক হওয়ার কথা অস্বীকার করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ আলী জায়েদি। এক্সে আরেক পোস্টে তিনি দাবি করেন, অন্তত ১৩৩ জন আফগান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। তার ভাষ্য, ২৭টি আফগান সেনা পোস্ট ধ্বংস ও ৯ জন যোদ্ধা আটক করা হয়েছে। কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় আরো অনেক হতাহতের আশঙ্কার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

গত কয়েক মাস ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। অক্টোবরে সীমান্ত সংঘর্ষে অনেক সেনা, বেসামরিক ও সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়। কাবুলে বিস্ফোরণের ঘটনার জন্য আফগান কর্মকর্তারা পাকিস্তানকে দায়ী করলে দেশটির অভ্যন্তরে ‘জঙ্গি’ আস্তানায় হামলা চালায় ইসলামাবাদ।

কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি মোটামুটি বহাল থাকলেও সীমান্তে মাঝে মধ্যেই গোলাগুলি হয়েছে। নভেম্বরে কয়েক দফা শান্তি আলোচনা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

সীমান্তবর্তী এলাকায় গত রোববার হামলা চালিয়ে অন্তত ৭০ জন জঙ্গি নিহতের দাবি করে পাকিস্তান। আফগানিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, নারী-শিশুসহ অনেক বেসামরিক নিহত হয়েছে। তাদের দাবি, পূর্বাঞ্চলের একটি মাদ্রাসা ও একাধিক বাড়িঘরসহ বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় হামলা করেছে, যা আফগান আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী হামলা বেড়েছে। এর জন্য পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি এবং নিষিদ্ধ বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে আসছে ইসলামাবাদ। টিটিপি আফগান তালেবান থেকে আলাদা হলেও ঘনিষ্ঠ মিত্র। পাকিস্তানের অভিযোগ, টিটিপি আফগানিস্তানের ভেতর থেকে কার্যক্রম চালায়। তবে টিটিপি ও কাবুল উভয়ই এ দাবি অস্বীকার করে আসছে।

আরও