বিবিসি

ফ্রান্সের স্পাই স্কুল: যেখানে ছদ্মনামে প্রশিক্ষণ নেন আসল গুপ্তচররা

জেমস বন্ডের সিনেমা দেখে যারা গোয়েন্দা হওয়াকে কেবল রোমাঞ্চকর মনে করেন, তারা ভুল করছেন। আধুনিক গোয়েন্দাগিরির বড় অংশই এখন কম্পিউটারের সামনে বসে তথ্য বিশ্লেষণ বা আর্থিক অপরাধ দমন করা। বর্তমানে ফ্রান্সে প্রায় ২০ হাজার গোয়েন্দা সক্রিয় রয়েছে

প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত ধূলিমলিন ধূসর ভবন আর বিশাল লোহার গেটে ঘেরা এক ক্যাম্পাস। বাইরে থেকে দেখে আর দশটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মনে হলেও, এর ভেতরেই তৈরি হচ্ছে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ গোয়েন্দা বা স্পাইরা। সায়েন্স পো সেন্ট-জার্মেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গোপন কোর্সে এমন অনেকেই ক্লাস করেন, খোদ প্রফেসররাও যাদের আসল নাম জানেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর জেভিয়ার ক্রেতিয়েজ স্বীকার করেছেন যে, তার কোর্সে অংশ নেয়া অনেক শিক্ষার্থীর আসল পরিচয় তিনি নিজেও জানেন না। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন তাদের এজেন্টদের এখানে পাঠায়, আমি তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খুব কমই জানতে পারি। এমনকি আমাকে যে নামগুলো দেয়া হয়, সেগুলোও আসল কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

কোর্সটির নাম ‘ডিপ্লোমা অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড গ্লোবাল থ্রেটস’—বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় গোয়েন্দা কার্যক্রম ও বৈশ্বিক হুমকি বিষয়ক ডিপ্লোমা। এটি তৈরি করা হয়েছে ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রশিক্ষণ শাখা ‘আকাদেমি দ্যু রঁসেইয়মঁ’-এর সহযোগিতায়।

২০১৫ সালে প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রান্স সরকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে ব্যাপক নিয়োগ শুরু করে। সে সময় সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন গোয়েন্দা তৈরি ও পুরোনোদের দক্ষতা বাড়াতে একটি বিশেষ কোর্স চালু করার অনুরোধ জানায় ফরাসি সরকার।

১২০ ঘণ্টার এ কোর্সে প্রায় ২৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। যেখানে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পড়াশোনা করেন ফ্রান্সের সক্রিয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বয়স যেখানে ২০-এর কোঠায়, সেখানে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের বয়স সাধারণত ৩৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। কোর্সের মূল লক্ষ্য হলো—বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা হুমকি শনাক্ত, তা বিশ্লেষণ ও মোকাবিলার কৌশল শেখানো। পড়ানো হয় সংগঠিত অপরাধের অর্থনীতি, ইসলামি জঙ্গিবাদ, করপোরেট গোয়েন্দাগিরি ও রাজনৈতিক সহিংসতা।

প্রফেসর ক্রেতিয়েজ মনে করেন, জেমস বন্ডের সিনেমা দেখে যারা গোয়েন্দা হওয়াকে কেবল রোমাঞ্চকর মনে করেন, তারা ভুল করছেন। আধুনিক গোয়েন্দাগিরির বড় অংশই এখন কম্পিউটারের সামনে বসে তথ্য বিশ্লেষণ বা আর্থিক অপরাধ দমন করা। বর্তমানে ফ্রান্সে প্রায় ২০ হাজার গোয়েন্দা সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে বিদেশে কাজ করা সংস্থা ডিজিএসই আর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দেখভাল করা ডিজিএসআই। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রাকফিনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ফ্রান্সে মাফিয়া তৎপরতা ও মাদক ব্যবসা থেকে আসা বিপুল অর্থ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

কোর্সে পড়ান সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সাবেক কূটনীতিক, ট্রাকফিনের শীর্ষ কর্মকর্তা এমনকি ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি ইডিএফের নিরাপত্তা প্রধানও। বড় বড় প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বিলাসপণ্যের কোম্পানিগুলোও এ কোর্সের শিক্ষার্থীদের নিয়োগে আগ্রহী। কারণ সাইবার হামলা ও শিল্প গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

এ কোর্সে আবেদন করতে হলে ফরাসি নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক। প্রফেসর ক্রেতিয়েজ জানান, প্রতি বছরই অনেক বিদেশি নাগরিক (বিশেষ করে ইসরায়েল বা রাশিয়ার দিক থেকে) এ কোর্সে ভর্তির আবেদন করেন। তিনি বলেন, আকর্ষণীয় সিভি সম্বলিত এ আবেদনগুলো আমরা সাথে সাথেই ডাস্টবিনে ফেলে দেই, কারণ এগুলো প্রায়ই ছদ্মবেশী বিদেশি চরদের গোয়েন্দা কৌশল শেখার অপচেষ্টা হয়ে থাকে।

চলতি বছরে ২৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন সক্রিয় গুপ্তচর। বিরতির সময় আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই তাদের চেনার সহজ উপায়। তারা কেবল প্রথম নাম দিয়ে হাজিরা দেন। এমনকি ক্লাসে ছবি তোলার সময়ও গোয়েন্দা শিক্ষার্থীরা ক্যামেরার উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ান, যাতে তাদের পরিচয় ফাঁস না হয়ে যায়।

আরও