বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনিভিত্তিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ‘এক টাকা’ পারিশ্রমিক নেয়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা আরিফিন শুভ। পরে সরকারি সিদ্ধান্তে তাকে রাজউকের পূর্বাচল নিউটাউন প্রকল্পে একটি ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দের ঘোষণা দেয়া হয়। একইভাবে ‘চিরঞ্জীব মুজিব’ চলচ্চিত্রের প্রযোজক লিটন হায়দারকেও বরাদ্দ দেয়া হয় রাজউকের ৩ কাঠার একটি প্লট।
রাজউকের সংরক্ষিত প্লট থেকে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ২৮৫ জনকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৪৯টিই পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের এমপি, শীর্ষ আমলা, ছাত্রলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেতারা। সে সময় ঢাকায় প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিক জনপ্রতিনিধিদেরও প্লট বরাদ্দ দিয়েছিল রাজউক। এ বিষয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই এভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন তারা।
শেখ হাসিনার সরকার গত দেড় দশকে একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রশাসন কর্মকর্তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমলাদের পাশাপাশি চলে যায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। এজন্য পুরস্কার বা টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে অর্থ, ক্ষমতা, প্লট ও প্রাইজ পোস্টিং। এমনকি নারীদেরও অনৈতিকভাবে কাজে লাগানোরও নজির রয়েছে। এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশে কায়েম হয়েছে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতা বলয়ে। একই সঙ্গে বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোকে যেতে হয়েছে ব্যাপক দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়ায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে দীর্ঘ চার দশক শাসনের পর স্বৈরশাসকের তকমা পাওয়া হুন সেন নিজ ছেলের হাতে প্রধানমন্ত্রিত্ব তুলে দিয়েছেন গত বছর। যদিও হুন সেন দেশটির সিনেটের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এখনো শীর্ষ ক্ষমতার অধিকারী। অভিযোগ আছে, তার শাসনামলে কম্বোডিয়ায় দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক মাত্রায়। ক্ষমতা বলয়ের মধ্যকার ব্যক্তিরা এ সময়ের মধ্যে হয়ে উঠেছেন বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে তার বিরোধীদের ওপর চালানো হয়েছে ব্যাপক দমন-পীড়ন। এমনকি কয়েক বছর আগে দেশটির প্রধান বিরোধী দলকে বিলুপ্তও ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে। আর বিরোধী দলের নেতা কেম সোখাকে দেয়া হয়েছে ২৭ বছরের কারাদণ্ড। রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে এ সাজা দেয়া হয়।
কম্বোডিয়ায় হুন সেন নিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে জনসাধারণের মধ্যে বিস্তর দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও গত দেড় দশকের শাসনামলে ব্যাপক জনসাধারণ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল সরকার। এর বিপরীতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগকে নির্ভর করতে হয়েছে সরকারের আমলা, প্রশাসন, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি এমনকি সামরিক বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তার ওপর, যারা ক্ষমতার শীর্ষে থেকে আওয়ামী সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন। যেখানে অর্থ দিয়ে সুবিধা হয়নি, সেখানে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করা হয়েছে। প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে প্রাইজ পোস্টিংয়ের সুবিধা দেয়া হয়েছে। আর এগুলোর সুবিধাভোগীরাও গত দেড় দশকে জনগণ ও বিরোধীদলীয়দের ওপর নিপীড়ন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, গুম, খুন, লুটপাট ও নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন।
বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন নিয়ে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য শুধু রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করেনি। আমলা-পুলিশের ওপরেও ব্যাপকমাত্রায় নির্ভরতা ছিল। বিভিন্ন সেক্টরে ছিল সুবিধাবাদী লোক। দেশের ব্যাংক খাত পরিচালিত হয়েছে সুবিধাভোগী লোকজনের দ্বারা। লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকগুলো থেকে তছরুপ হয়েছে। এস আলমের মতো গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করে ঋণ নিয়েছে। গার্মেন্টস মালিকদের মধ্যে ৯০ শতাংশই বিদেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্পদ গড়েছে। ওয়াসার এমডিকে সাতবারের মতো নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব কাজ যারা করেছে তাদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল। কাজেই এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দলের সম্পর্ক হয়েছে।’
দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সহযোগীদের রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পের প্লট দিয়ে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিটি চালু হয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে। আর তা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায় শেখ হাসিনার গত দেড় দশকের শাসনামলে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দের বিষয়টি। সেখানে জমির কাঠাপ্রতি গড় দাম এখন কোটি টাকার বেশি। এ প্রকল্পের জমি সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। কোটা সুবিধায় প্রকল্পের আবাসিক প্লটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই পেয়েছেন তারা। লটারির মাধ্যমে তাদের প্রকল্পের জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার কাঠারও বেশি। কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ থেকে শুরু হয়ে বর্তমান বাজারদরে জমির মূল্য উঠেছে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত।
এভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিত্তশালী হওয়ার পথ করে দিয়েছে পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ। যারা প্লটের বরাদ্দ পেয়েছেন, আর্থিকভাবে অভাবনীয় মাত্রায় লাভবান হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তারা। পূর্বাচলের জমি বিক্রি করে এ কর্মকর্তাদের হাতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ আসছে। সারা জীবন চাকরির পর পেনশন হিসেবে মোট যে পরিমাণ অর্থ তাদের প্রাপ্য হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ তারা আয় করে নিচ্ছেন শুধু পূর্বাচলের প্লট বিক্রি করে।
প্রকল্পটিতে প্রথম পর্যায়ের লটারির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ১ হাজার ৬৩২টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবীদের ৬৫৪, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোটায় ৪৭২, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৫৯১, প্রবাসী কোটায় ৫৯১, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৬, সচিব কোটায় ২৪, আইনজীবী কোটায় ১১০, বিচারপতি কোটায় ১৪, সংসদ সদস্য কোটায় ৫৭, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোটায় ৫৭, অন্যান্য কোটায় ১৮১, শিল্পী কোটায় ১৫১ ও সাংবাদিক কোটায় ৫৫টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া রাজউক কর্মকর্তা, সংরক্ষিত ও প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। লটারির পরও বিভিন্ন সময় পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রথম বরাদ্দের পর থেকে এ পর্যন্ত জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রচুর প্লটের মালিকানা বদল হয়েছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্লট ক্রয়মূল্যের চেয়ে ১৫-২০ গুণ দামে বিক্রিরও নজির রয়েছে। লটারিতে প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন ঊর্ধ্বতন এক সরকারি কর্মকর্তা। বরাদ্দ পাওয়া থেকে শুরু করে ইজারা দলিল হাতে পাওয়া পর্যন্ত তার ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ টাকার মতো। ১৭ নম্বর সেক্টরের পাঁচ কাঠা প্লটের জমিটি তিনি বছর চারেক আগে কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা দরে মোট আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন।
প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের সামরিক বাহিনীকেও অনুগত রাখার প্রয়াস চালিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীর জন্য জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় আওয়ামী লীগ আমলের শীর্ষ অলিগার্কদের একজন আহমেদ আকবর সোবহানের বসুন্ধরা গ্রুপও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীকে নানা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পেও যুক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম ‘হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প’। এছাড়া ঢাকা ও আশপাশের সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন, যানজট নিরসন, হাতিরঝিল ইউলুপ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সিফটিং নির্মাণ প্রকল্প, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, মিরপুর এয়ারপোর্ট রোডে ফ্লাইওভার, বনানী রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ, ধানমন্ডি লেক উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প এবং রায়েরবাজার কবরস্থানের উন্নয়ন প্রকল্পেও সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে। অবকাঠামো খাতে যুক্ত করে সেনাবাহিনীকে পেশাদার একটি সামরিক বাহিনীর মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে অনেকের।
আওয়ামী লীগের আমলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতি অগ্রাধিকারগুলোকে বদলে ফেলেছিলেন সরকারের শীর্ষ আমলারা। অভিযোগ আছে দুর্নীতির মাধ্যমে এ খাতের বড় ব্যবসায়ীদের অবাধ মুনাফার সুযোগ করে দিতে সরকারকে দিয়ে নানা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রেও অন্যতম পুরোধা হিসেবে ছিলেন আরেক সাবেক মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস। এমনকি আইনি সুবিধার (বিশেষ আইন) মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক সুবিধা ও টেন্ডারবাজির সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। দেশে বেসরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাগুলো অনেকটা তারই সাজানো। রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ী, রূপপুরসহ বৃহৎ মেগাপ্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা, টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরূদ্ধে।
বিদ্যুৎ খাতকে বিদেশী ও বেসরকারি উদ্যোক্তানির্ভর করে তোলার পুরস্কার হিসেবে ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে পদায়ন হয় এই কর্মকর্তার। এরপর ক্ষমতার বলয়ে থেকে প্রশাসনে আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের নানা সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনুগত আমলা হিসেবে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে থেকে কাজ করেছেন তিনি।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে আলোচিত সরকারি কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সালের পর্যন্ত পুলিশের বিভিন্ন সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি মহাপরিচালক থাকাকালে সবচেয়ে বেশি গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য সমালোচিত হয় র্যাব। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে রাতের আঁধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালিত অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ। শেখ হাসিনার তিন মেয়াদে বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রশাসনিক লক্ষ্যপূরণের পুরস্কার হিসেবে তাকে পর্যায়ক্রমে পুলিশের বিভিন্ন শাখার শীর্ষ পদে পদায়ন করা হয়েছিল। ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, এর পর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে আইজিপির পদে পদায়ন হয় তার। অনেকগুলো পদকও পেয়েছেন তিনি। আবার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ বানিয়েছেন তিনি। দুদকের সম্পদ বিবরণীর এক নথিতে দেখা যায়, বেনজীর ও তার পরিবার ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ২০৪ একরের বেশি জমি কিনেছেন। এর মধ্যে ১১২ একর কিনেছেন তিনি পুলিশ ও র্যাব প্রধান থাকাকালে। এ পর্যন্ত তদন্তকারীরা ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও কক্সবাজারে তার এবং তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের মালিকানাধীন জমির সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১১২ একর জমি তার নিজ জেলা গোপালগঞ্জে।
বেনজীরের মতো পুলিশের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও রয়েছে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এরই মধ্যে পুলিশের সাবেক এ কর্মকর্তার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে দুই সদস্যর কমিটি গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নানা মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের সাবেক এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্ত্রীর নামে ঢাকায় একটি বাড়ি ও দুটি ফ্ল্যাট এবং মেয়ের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ৬৭ শতক জমি রয়েছে। এ তিন জেলায় তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে আরও ১৬৬ শতক জমি।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত পনের বছর আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে তাদের ওপর অর্পিত ক্ষমতাকে দেখেছে নিজেদের স্বার্থ এবং সম্পদ বিকাশের উপায় হিসেবে। জনগণকে সরিয়ে সেই ক্ষমতা উপভোগ করার জন্য উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহারকে লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেটাকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন-দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন একচ্ছত্রভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে একপেশে ক্ষমতা দিয়ে তাদেরকে দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কথা বলেছে, মনে হয়েছে দলীয় মুখপাত্র।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাহী বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের অন্যতম সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ) সভাপতি ও মহাসচিব পদে ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রশাসনে বহু তদবির-রদবদলের নেপথ্যের ব্যক্তি তিনি। বিলাসী জীবন ও অস্ত্রসহ ঘোরাফেরার জন্য তার ছিল সুখ্যাতি। আলোচনায় এসেছেন চাকরি-পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরোত্তর ছুটিতে থাকাকালে যুক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। আনুগত্যের পুরস্কার (প্রাইজ পোস্টিং) হিসেবে গত বছরের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের চেয়ারে অধিষ্ঠিত করা হয় তাকে।
অবৈধভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখায় ভূমিকা পালনের জন্য অন্যান্য আমলাদেরও নানা সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ছিল সংসদে জনপ্রতিনিধিদের চেয়েও বেশি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমলাদেরও মন্ত্রীদের মতো জনসাধারণের করের টাকা নিজের বাবা-মায়ের নামে নানা প্রতিষ্ঠান তৈরির উদাহরণ আছে। সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ নিজ গ্রামে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অর্থায়নে মায়ের নামে ‘করিমপুর নূরজাহান-সামসুন্নাহার মা ও শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল’ নির্মাণ করেছিলেন। একই সুবিধা পেয়েছেন আমলারাও। সাবেক সমাজকল্যাণ সচিব জুয়েনা আজিজের নানা-নানির নামে নোয়াখালীতে ফেরদৌস-মজিদ প্রতিবন্ধী সেবাকেন্দ্র ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়।
দেশের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের বিভাগের পাশাপাশি আর্থিক খাতে লুটপাত, অনিয়ম, অর্থপাচারসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে গত দেড় দশকে। আর এসব কাজে সরকারকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতার অভিযোগ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরদের। এর মধ্যে অধ্যাপক ড. আতিউর রহমানের আমলে অনুমোদন পায় নতুন নয়টি ব্যাংক। আর ফজলে কবিরের অনুমোদন পায় আরো চারটি।
ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও সুযোগ দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। তার অন্যতম উদাহরণ যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া। অবৈধ অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান, জাল নোটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য, জায়গা জমির দখল বেদখল ও অনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছিলেন পাপিয়া। ২০২০ সালে পাপিয়াকে গ্রেফতারের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন র্যাব-১-এর অধিনায়ক শাফিউল্লাহ বুলবুল জানিয়েছিলে, কিভাবে রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলে বসে নারীদের দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও নির্যাতনের সেল গড়ে তুলেছিলেন যুব মহিলা লীগের সাবেক এ নেত্রী। মেয়েদের আপত্তিকর ছবি বিত্তবান ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনে পাঠাতেন তিনি এবং এরপর বিত্তবান কেউ আগ্রহী হয়ে এলে তাকে জিম্মি করা হতো। তারা বেশকিছু নারীর ভিডিও ক্লিপ পেয়েছেন যেগুলো নারীর জন্য মর্যাদাকর নয়।
রাজনৈতিক পদকে পুঁজি করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ক্যাসিনো বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদের রাজত্ব গড়ে তোলেন যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাঈল হোসেন সম্রাট। রাজনৈতিক পদপদবি ব্যবহার করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার, বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া আর ক্যাসিনো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে একপর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক বনে যায় সম্রাট। ক্যাসিনোর এ রমরমা ব্যবসা দেশের ভেতরেই থেকে থাকেনি তার। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই কোটি টাকা পাচার করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। যদিও সম্রাটের বিরূদ্ধে করা মানি লন্ডারিং মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি জানায়, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ১৯৫ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে সম্রাটের বিরূদ্ধে। হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় পাচার করা টাকার বড় অংশই সম্রাট ক্যাসিনোতে খরচ করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক পদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সম্রাটের মতো ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসা করে তোলেন যুবলীগের আরেক নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। আওয়ামী লীগ শাসনামলে এক প্রকার নীরবে ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে গেলেও তীব্র বেপরোয়া হলে উঠলে ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি খালেদকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে পরিচালিত ওই ক্যাসিনোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন খালেদ। ক্যাসিনো খালেদের বিরূদ্ধে ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি অভিযোগপত্র অনুমোদন দেয়। ওই অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে ৪২ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৪ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৮ কোটি ৭৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা পাচারের তথ্য রয়েছে ছিল। তদন্তে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের একাধিক ব্যাংক হিসেবে খালেদ মাহমুদের আরো অর্থের সন্ধান পাওয়া যায়। ক্যাসিনোর মামলায় আটক করে তাকে রিমাণ্ডে নেয়া হলে খালেদ জানান, প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ঠিকাদারি কাজ নিতেন তিনি। সিটি করপোরেশনের মতিঝিলের সড়ক মেরামতের ৫২ কোটি টাকার কাজ এবং পূর্বাচলে ৪০ কোটি টাকার সরকারের একটি প্রকল্পের কাজ করেন খালেদ।
শেখ হাসিনা সরকারকে দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান সক্রিয় ছিল, এখনো আছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ফ্যাসিস্ট উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। সেই সঙ্গে তাদের চেষ্টাও ছিল। একই সঙ্গে তারা এর ওপর ভরসা করেই টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকায় সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসিকে হাতে রাখার জন্য যে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেয়া সেটি দিয়ে রাখতে হয়েছে। এর পাশাপাশি জনগণের সফট বিষয়গুলো ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মের ব্যবহার। এ ধরনের শাসনের সময় একদিকে বল প্রয়োগ করা হয়। অন্যদিকে মানুষের সফট বিষয়গুলোয় আধিপত্য বিস্তার করা। এ ধরনের শাসকগোষ্ঠীর বড় একটি সমর্থক থাকে। যেমন আইয়ুব খানের সময় স্বৈরতন্ত্র ছিল কিন্তু জনগণের সমর্থন এই পর্যায়ে ছিল না। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অন্যদিকে ধর্ম দুটিকেই কাজে লাগিয়েছে। এর ওপরই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জনগণের ক্ষোভের মাত্রা এবং তাদের ভূমিকা থেকেই আজকে এ অবস্থাটি তৈরি হয়েছে।’