অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে এ-যাবৎ কালের সব চুক্তি পুনরায় যাচাই করা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ শর্তে যাওয়া উচিত। এছাড়া চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ১০০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানায় সংস্থাটি। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
খন্দকার মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিগত সরকার যে প্রজেকশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটি আসলে সঠিক নয়। কারণ আমাদের চাহিদার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাড়তি ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হতো। যেটি শুধু কিছু বেসরকারি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। চাহিদা অনুমান করার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও ছিল মনগড়া। যেসব চুক্তি এরই মধ্যে হয়েছে সেগুলোয় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ যেগুলোয় সুযোগ আছে বাদ দেয়া দরকার। কুইক রেন্টাল ও ব্যয়বহুল যে কেন্দ্রগুলো আছে সেগুলোর যেন দ্রুততম সময়ে অবসান হয়। একই সঙ্গে যেসব প্রিপেইড মিটারের কারণে ভুতুড়ে বিল আসে সেসব মিটার বাতিল এবং গ্রাহক হয়রানির সব ধরনের সুযোগ বন্ধ করা দরকার।’
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই অ্যাক্ট’-এর মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়েছিল। ২০১০ সাল থেকে মধ্যবর্তী সময়ে অনেকবার সংশোধন করা হয়েছিল। বর্তমানে আমরা বাড়তি বিদ্যুৎ ক্যাপাসিটির ভারে ন্যুব্জ। এ আইনকে পুঁজি করে বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। আমরা মনে করি, এই অ্যাক্টটিকে বাতিল করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট যেটি রয়েছে ২০০৬ সালের এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮-এর আলোকে আগামী দিনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সরকারি ক্রয় নিরূপণ করা প্রয়োজন।’
এতে আরো বলা হয়, ‘আদতে বিইআরসির কাজ অনেক ব্যাপক। ২০২০ ও ২০২৩ সালে কিছু আইন করে এ সংস্থাকে একটি নখদন্তহীন বাঘে পরিণত করেছে। সংস্থাটিকে তার শুরুর দিকের ভূমিকায় ফিরিয়ে নেয়া দরকার। এছাড়া ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি ১৯৯৬ সালে করা হয়েছিল। এরপর আর এটি নিয়ে কাজ হয়নি। এটি আবার নতুন করা দরকার। রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসিও পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিগত সরকারের আমলে এ খাতে প্রতিযোগিতার অভাব দেখেছি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেখেছি। এ খাতে নীতিগত সিদ্ধান্তে বিগত সরকারের আমলে বড় বড় কোম্পানির প্রভাব ছিল। কিন্তু তার পরও বিগত সরকারের সময়কালে সারা দেশে বিদ্যুৎ প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হয়েছে। সরকার ও বেসরকারি বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ছিল। তবে এ কাজগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলে দুর্নীতি কম হতো। বিশেষ করে অপচয় বহুলাংশে কম হতো। সুশাসন নিশ্চিত হলে, জবাবদিহিতা থাকলে এ খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হতো। সেই জায়গাগুলোর ভিত্তিতেই সংস্কার প্রয়োজন। দেশে অর্থনৈতিক যে অস্থিরতা তার জন্য এককভাবে যদি দায়ী করতে হয় তাহলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দায়ী করলে ভুল হবে না।’
বিদ্যুতের চাহিদা ও বাস্তবতার ফারাক নিয়ে তিনি বলেন, ‘২০৪১ সালে বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে ২৭ হাজার মেগাওয়াট, রিজার্ভ মার্জিনসহ ৩৫ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকতে পারে।’